Dark
🌙
☀️
Light
রুশ পত্রিকা প্রাভদা কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা সংক্রান্ত ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে দেশীয় সংবাদপত্রের করা ফিচার।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যা ও বধ্যভূমিসমূহ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা—যেমন রাজাকার, আলবদর ও আলশামস—সুবিন্যস্তভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই সময়ে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় গণহত্যা, নারী ও শিশুদের ওপর ধর্ষণ, গ্রামাঞ্চলে অগ্নিসংযোগ, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের হত্যাযজ্ঞ এবং স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়, শতশত গ্রাম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি, চুকনগর, গোমদন্ডি ও অন্যান্য গণহত্যার স্থানসমূহ এ সময়কার ভয়াবহতার প্রতীক। ইতিহাসবিদরা এই ঘটনা শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা শুধু একটি দেশের স্বাধীনতা নয়, বরং একটি জাতির পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের চরম উদাহরণ।

গণহত্যার প্রেক্ষাপট

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে "অপারেশন সার্চলাইট" শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ছাত্রসমাজ, হিন্দু সম্প্রদায় এবং বুদ্ধিজীবীদের নির্মূল করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, পুরান ঢাকা—সব জায়গায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সংবাদপত্রের শিরোনাম
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সংবাদপত্রের শিরোনাম।

বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক-মজুর থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে যুদ্ধকালীন সময়ে। এই হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য পাক হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকাররা কিছু নির্দিষ্ট স্থান বেঁছে নিয়েছিল। এসকল স্থান বধ্যভূমি নামে পরিচিত। এ যাবৎ দেশের বহু কিছু স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুসারে ঢাকা বিভাগে ৮৬, রাজশাহী বিভাগে ১৪৭, চট্রগ্রাম বিভাগে ৮৭, খুলনা বিভাগে ৬৭, বরিশাল ২২ ও সিলেট বিভাগে ৫৭ স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গণহত্যার মাত্রা

বিভিন্ন গবেষণা ও নথি অনুযায়ী:

একটি গণকবর থেকে প্রাপ্ত শহীদদের দেহাবশেষ
একটি গণকবর থেকে প্রাপ্ত শহীদদের দেহাবশেষ।

এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পরিকল্পিত, রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত এবং জাতিগত ও রাজনৈতিক নিধনমূলক।

উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমিসমূহ

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে অসংখ্য বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য:

১. রায়েরবাজার বধ্যভূমি (ঢাকা)

রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ
রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী আলবদর বাহিনী পরিকল্পিতভাবে দেশের শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে মিরপুরে ফেলে দেয়। নিহতরা ছিলেন শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী ও চিন্তাবিদরা। স্বাধীনতার প্রাক্কালে জাতির মেধাশক্তিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড ছিল এক সুপরিকল্পিত ও ভয়াবহ গণহত্যা।

রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ফেলে দেয়া নিথর মৃতদেহ
রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ফেলে দেয়া নিথর মৃতদেহ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি চিহ্নিত হয়ে আছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে। রায়ের বাজার বধ্যভূমি কেবল একটি বধ্যভূমি নয়, এটি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী স্মৃতিচিহ্ন। এখানে নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো—

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবীগণ

  • এএনএম মুনীর চৌধুরী: অধ্যাপক - বাংলা বিভাগ
  • ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব: অধ্যাপক - দর্শন বিভাগ
  • মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী: অধ্যাপক - বাংলা বিভাগ
  • আনোয়ার পাশা: অধ্যাপক ও লেখক - বাংলা বিভাগ
  • ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা: অধ্যাপক - ইংরেজি বিভাগ
  • আবদুল মুকতাদির: অধ্যাপক - রসায়ন বিভাগ
  • এস এম রাশীদুল হাসান: অধ্যাপক - ইংরেজি বিভাগ
  • ড. এন এম ফয়জুল মাহী: অধ্যাপক - পদার্থবিদ্যা বিভাগ
  • ফজলুর রহমান খান: অধ্যাপক - পদার্থবিদ্যা বিভাগ
  • ড. সিরাজুল হক খান: অধ্যাপক - পদার্থবিদ্যা বিভাগ
  • ড. শাহাদাত আলী: অধ্যাপক - বাংলা বিভাগ
  • ড. আনোয়ারুল আজিম

অন্যান্য বিশিষ্ট শহীদ বুদ্ধিজীবী

  • শহীদুল্লাহ কায়সার: সাংবাদিক ও লেখক
  • সেলিনা পারভীন: সাংবাদিক
  • আলতাফ মাহমুদ: সুরকার ও সঙ্গীতশিল্পী
  • ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী
  • জহির রায়হান: চলচ্চিত্রকার ও লেখক
  • ড. ফজলে রাব্বি: হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
  • ড. আফম আলিম চৌধুরী: চক্ষু বিশেষজ্ঞ
  • সৈয়দ নজরুল ইসলাম: সাংবাদিক
  • আবুল হাসনাত: সাংবাদিক
শহীদ বুদ্ধিজীবিদের তালিকা
শহীদ বুদ্ধিজীবিদের তালিকা।

এই তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়, কারণ অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত হয়নি এবং অনেকে অজানাই রয়ে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা প্রায় ১,০০০-এর বেশি হতে পারে, যাদের মধ্যে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, প্রকৌশলী ও অন্যান্য পেশাজীবী ছিলেন।

এই নিথর দেহগুলো ছিল স্বাধীন জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা, জ্ঞান ও নেতৃত্বের প্রতীক। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

শহীদ বুদ্ধিজীবি সেলিনা পারভীন
শহীদ বুদ্ধিজীবি সেলিনা পারভীন।

আজও রায়ের বাজারের এই স্থান জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা কেবল যুদ্ধজয়ের ফল নয়; এটি এসেছে অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও নিরীহ মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। এই দিবস প্রতিটি বাঙালি জাতিকে তাদের শিক্ষা, আদর্শ ও সাহসকে মনে রাখার আহ্বান জানায়।

২. মিরপুরস্থ বধ্যভূমিসমূহ (ঢাকা)

মিরপুর বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ
মিরপুর বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ।
    মুক্তিযুদ্ধের সময় মিরপুর ছিল ঢাকার অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা–অধ্যুষিত এলাকা। যুদ্ধের পুরো নয় মাস এবং বিশেষ করে শেষ পর্যায় পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী আলবদর, আলশামস ও স্থানীয় দালালরা এই এলাকাকে পরিকল্পিত হত্যাকেন্দ্রে পরিণত করেছিল। মিরপুরে সংঘটিত প্রধান গণহত্যা ও বধ্যভূমির স্থানগুলো হলো

    ক. মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার বধ্যভূমি

    • বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকাগুলোতে বহু মানুষকে গুলি বা জবাই করে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হতো।
    • পরবর্তীতে নদীতীরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে–ছিটিয়ে নরকঙ্কাল পাওয়া যায়।

    খ. মিরপুর সিরামিক এলাকা ও পাম্প হাউস বধ্যভূমি

    • নিয়মিতভাবে হত্যা ও লাশ গুমের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
    • পরিত্যক্ত ভবন ও অবকাঠামোগুলো গণহত্যার প্রমাণ লুকানোর জন্য উপযোগী হওয়ায় এগুলো বারবার ব্যবহৃত হয়।

    গ. মিরপুর সেকশন–১১ ও সেকশন–১২ বধ্যভূমি

    • মিরপুর সেকশন–১১ ও সেকশন–১২ এলাকাতেও অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়ি থেকে মানুষ ধরে নিয়ে হত্যা করা হতো।
    • নিহতদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী, পেশাজীবী, শিক্ষক, ছাত্র এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।

    ঘ. মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার বধ্যভূমি

    • সশস্ত্র দালাল ও সহযোগীদের একটি শক্ত ঘাঁটি, যেখানে আটক, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো।
    • এখানে আটক, নির্যাতন ও হত্যার পর অনেককে জল্লাদখানাসহ বড় বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হতো।

    ঙ. মিরপুর উদ্ভিদ উদ্যানসংলগ্ন এলাকা (তৎকালীন অনুন্নত অঞ্চল)

  • নির্জন ও জঙ্গলাকীর্ণ এলাকাগুলো গোপন হত্যাকাণ্ড ও গণকবরের জন্য ব্যবহৃত হতো।।
মিরপুর উদ্ভিদ উদ্যানসংলগ্ন বধ্যভূমি
মিরপুর উদ্ভিদ উদ্যানসংলগ্ন বধ্যভূমি।

৩. জল্লাদখানা বধ্যভূমি (মিরপুর)

দেশের বৃহৎ ও ভয়াবহ বধ্যভূমিগুলোর অন্যতম হলো মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো নয় মাস ধরে এই স্থানটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের বিহারী দোসরদের দ্বারা সংগঠিত নির্যাতন ও গণহত্যার এক নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা হাজার হাজার নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষকে এখানে নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়। এই বধ্যভূমি শুধু হত্যার স্থানই ছিল না, বরং এটি ছিল পরিকল্পিত গণনিধনের একটি কেন্দ্র।

দীর্ঘদিন অবহেলিত ও অচিহ্নিত অবস্থায় থাকার পর ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে খননকাজ শুরু হয়। খননকালে পরিত্যক্ত একটি পাম্প হাউসের ভেতরে থাকা কূপ থেকে উদ্ধার হয় হৃদয়বিদারক প্রমাণ—৭০টি মানুষের খুলি এবং ৫,৩৯২টি বিভিন্ন ধরনের হাড়গোড়। এসব দেহাবশেষের মধ্যে নারী, পুরুষ ও বিভিন্ন বয়সের মানুষের চিহ্ন স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, যা এখানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতার ভয়াবহতা তুলে ধরে।

মিরপুর জল্লাদখানা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও বধ্যভূমি
মিরপুর জল্লাদখানা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ও বধ্যভূমি।

এছাড়াও কূপ দুটির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় যুদ্ধকালে নিহত ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের স্মৃতি বহন করে এবং সেই সময়ের নির্মম বাস্তবতার কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এই সব নিদর্শন আজও প্রমাণ করে, মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি ছিল ১৯৭১ সালের গণহত্যার এক জ্বলন্ত প্রতীক—যেখানে মানবতা নির্বিচারে পদদলিত হয়েছিল।

৪. চুকনগর গণহত্যা (খুলনা)

চুকনগর গণহত্যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং এদেশীয় রাজাকার-আলবদর বাহিনীর যৌথ নৃশংস কর্মকাণ্ডের একটি নিদর্শন। এটি মূলত একটি সামরিক গণহত্যা, যা ১৯৭১ সালের ২০ মে সংঘটিত হয়। চুকনগর ভারতীয় সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নিরাপদ আশ্রয় ও সীমান্ত অতিক্রমের উদ্দেশ্যে এখানে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের লোকজন ভদ্রা নদী পার হয়ে চুকনগরে এসে জড়ো হয়, যার সংখ্যা লক্ষাধিক হিসেবে ধারণা করা হয়।

২০ মে বেলা প্রায় ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি দল ট্রাক ও জিপে চুকনগর বাজারের উত্তর প্রান্তে “কাউতলা” নামে পরিচিত স্থানে পৌঁছায়। সেখান থেকে তারা পাতখোলা বাজারে গুলি চালানো শুরু করে এবং পরবর্তীতে চুকনগর বাজারের দিকে অগ্রসর হয়। গোলাগুলি বিকেল প্রায় তিনটা পর্যন্ত চলতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, এই এক দিনের গণহত্যায় প্রায় ১৩ হাজার বা তারও বেশি মানুষ নিহত হয়।

চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।

মৃতদেহের অধিকাংশ পাক বাহিনী নদীতে নিক্ষেপ করলেও, পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষদের প্রায় সব অবশিষ্ট মৃতদেহ নদীর পানিতে ফেলে দিতে বাধ্য করা হয়। গণহত্যার ধরন ছিল একেবারেই পরিকল্পিত ও সংগঠিত—লোকদের একত্রিত করা, গুলি চালানো, বেয়নেট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে হত্যা করা এবং নারীদের উপর নৃশংস নির্যাতন চালানো।

চুকনগর গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াবহ ও নৃশংস অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়। এটি কেবল নিরীহ মানুষের উপর বর্বরতা চালানোর ঘটনাই নয়, বরং পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক নীতির অংশ হিসেবে গণহত্যা ও আতঙ্ক সৃষ্টির একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

৫. পাহাড়তলী বধ্যভূমি চট্টগ্রাম

পাহাড়তলী বধ্যভূমি চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যা স্থান হিসেবে পরিচিত, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী দলগুলো দ্বারা অনুষ্ঠিত ভয়াবহ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী। চলতি ইতিহাস ও গবেষণা অনুযায়ী এটি ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ীভাবে গণহত্যার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল, এবং এখানেই অসংখ্য নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহায়ক দালাল বাহিনী পাহাড়তলী এলাকায় বহু বাঙালি মানুষকে ধরে এনে সেখানে হত্যা করেছিল। বিভিন্ন গবেষণা ও দলিলপত্র অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর একদিনে এখানে শত শত লোককে হত্যা করা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন দিনে সহিংসতা পরিচালিত ছিল।

পাহাড়তলী বধ্যভূমি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
পাহাড়তলী বধ্যভূমি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।

এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের কারণে পাহাড়তলী বধ্যভূমি স্থানীয়ভাবে ‘জল্লাদখানা’ নামেও পরিচিত। এখানে যুদ্ধের পরেও বহু মানুষের খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছে যা স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে প্রমাণ স্বরূপ বিবেচিত হয়। সরকারি নথি অনুসারে ১৯৭১-এর পর উদ্ধার হওয়া এক নির্দিষ্ট এলাকায় ১,১০০ টির মতো মানুষের খুলি পাওয়া গেছে, যা মূলত এখানকার গণহত্যার ভয়াবহতার প্রমাণ।

আসুন এবার জেলা ও এলাকাভিত্তিক বধ্যভূমিসমূহের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ড নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত শিরোনাম
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ড নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত শিরোনাম।

পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার গণহত্যা ও বধ্যভূমি

পঞ্চগড়

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

আলোয়াখোয়া গণহত্যা

পঞ্চগড়ের আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের বামনকুমার গ্রামের ডা. হাফেজের বাড়িতে হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরেরা কয়েকজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। একই কায়দায় দিনদুপুরে সুখ্যাতি গ্রামে খয়ের মুহম্মদ ও তাঁর ছেলে আশির উদ্দিনকে জুন মাসের দিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ডাংগীরহাট গণকবর, পঞ্চগড়
ডাংগীরহাট গণকবর, পঞ্চগড়।

বোদা গণহত্যা

১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বোদা এলাকায় প্রবেশ করে তিনজন মানুষকে হত্যা করে এবং বহু মানুষকে নির্মম নির্যাতনের শিকার করে। পরবর্তীতে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এখান থেকে ১৭ জনকে ধরে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী তৎকালীন থানায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

অমরখানা গণহত্যা

অমরখানা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে অসংখ্য বাঙালিকে ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।

মির্জাপুর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহের গণহত্যা

১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ২৪ কার্তিক, রোববার ইফতারের আগে মির্জাপুর গ্রামের ১১ জন মানুষকে ধরে নিয়ে নয়াদিঘির পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত পাশবিক নির্যাতন নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত শিরোনাম
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত পাশবিক নির্যাতন নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত শিরোনাম।

মীরগড় গণহত্যা

জুলাই মাসের ২১–২২ তারিখে রাজাকার ও বিহারিদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী মীরগড়ে ব্যাপক হামলা চালায়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরানো হয়। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আছির উদ্দিনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। কলেজছাত্র মিন্টু, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুল হুদা, মেরু মোহাম্মদসহ আরও অনেককে হত্যা করা হয়।

আটোয়ারি গণহত্যা

১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনীর দোসরেরা আটোয়ারি উপজেলার ধামোর ইউনিয়ন থেকে ২০–২৫ জন মানুষকে ধরে নিয়ে ডাঙ্গিরহাট পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে ভয়াবহ নির্যাতনের পর সবাইকে হত্যা করা হয়।

আটোয়ারি গণহত্যার স্মৃতি স্মারক স্তম্ভ
আটোয়ারি গণহত্যার স্মৃতি স্মারক স্তম্ভ।

ঠাকুরগাঁও

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

গোবিন্দনগর মন্দির ও গণকবর

ঠাকুরগাঁও জেলা শহরে প্রবেশমুখে, সত্যপীর ব্রিজসংলগ্ন ইপিআর ক্যাম্পে (যা পরবর্তীকালে বিডিআর এবং বর্তমানে বিজিবি ঠাকুরগাঁও সেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত) হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর একটি প্রধান হেডকোয়ার্টার স্থাপিত ছিল। এই কুখ্যাত ক্যাম্পে দিনের আলোতেই নিয়মিতভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। গোবিন্দনগর মন্দিরসংলগ্ন গণকবরে ইয়াসিন আলীকে জীবিত অবস্থায় রেখে তাঁর চোখের সামনেই তাঁর পাঁচ সন্তানকে একে একে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা, আর সেই বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞের পর তারা উল্লাসে মেতে ওঠে। এরপর নিহতদের মৃতদেহ মাটি খুঁড়ে সেখানে কবর দেওয়া হয়। কিছুদিন পর, শোক ও নির্যাতনের ভার সহ্য করতে না পেরে ইয়াসিন আলীও মৃত্যুবরণ করেন।

ইসলামনগর এলাকা ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগের একটি শক্ত ঘাঁটি। সেই এলাকার ছাত্রনেতা আহাম্মদ আলী, ইয়াকুব হোসেন, মোজাফফর, দবিরুল ইসলাম, নূরুজ্জামান ও সিরাজ উদ্দিনকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা বেয়নেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। হত্যার পর তাঁদের লাশ টাঙন নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এভাবেই ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রবাহিত টাঙন নদীটি কেবল একটি নদী হিসেবেই নয়, বরং গণহত্যার নীরব সাক্ষী এক বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল।

রানীশংকৈল বধ্যভূমি

রানীশংকৈলের ক্যাম্পে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজাকার ও শান্তিবাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের মা–বাবা ও নিকটাত্মীয়দের ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরিকল্পিত এই হত্যাযজ্ঞের শিকার মানুষদের লাশ এখানেই গোপনে সমাহিত করা হয়। তবে কোনো ধরনের সংরক্ষণ বা চিহ্নিতকরণের ব্যবস্থা না থাকায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব গণকবরের অধিকাংশই আজ প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে ইতিহাসের নীরব অথচ ভয়াবহ সাক্ষ্য হিসেবে।

অযত্ন ও অবহেলায় থাকা রানীশংকৈল বধ্যভূমি
অযত্ন ও অবহেলায় থাকা রানীশংকৈল বধ্যভূমি।

জাঠিভাঙ্গা বধ্যভূমি ও গণহত্যা

জাঠিভাঙ্গা গণহত্যা এই জেলার সংঘটিত নৃশংসতম গণহত্যাগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ ও ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। ঠাকুরগাঁও সদরের বালিয়া ইউনিয়নের কিসমত সুকানপুকুরী মৌজার জাঠিভাঙা গ্রামটি বর্তমানে ‘বিবাহপল্লী’ নামে পরিচিত হলেও ১৯৭১ সালে এটি ছিল এক ভয়ংকর মৃত্যুকূপ। এখানেই ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী দোসররা প্রায় আড়াই হাজার নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই রাজাকার, আলবদর ও আল-শামস বাহিনীর সহায়তায় হানাদার পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিকামী জনগণের ওপর অমানবিক নির্যাতন, লুটপাট ও গণহত্যা চালাতে শুরু করে। এই পাশবিক নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়া, সুকানপুকুরী, জগন্নাথপুর, চকহলদি, সিংগিয়া, চন্ডীপুর, বাসুদেবপুর, মিলনপুর, গৌরীপুর ও খামার ভোপলা; পাশাপাশি দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার পলাশবাড়ী এবং পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার সংখ্যালঘু পরিবার স্ত্রী–সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

জাঠিভাঙ্গা বধ্যভূমি
জাঠিভাঙ্গা বধ্যভূমি।

১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল পরিকল্পিত কৌশলের মাধ্যমে হানাদার বাহিনীর দোসররা এসব উদ্বাস্তু মানুষকে জাঠিভাঙ্গা নদীর তীরে জড়ো করে। রাজাকারদের দেওয়া সংবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সেনারা চারদিক থেকে নারী–পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে ঘিরে ফেলে। এরপর শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ—গুলিবর্ষণ ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় আড়াই হাজার পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং তাঁদের মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এই একদিনের হত্যাকাণ্ডেই আড়াইশ নারী বিধবা হয়ে পড়েন, অসংখ্য পরিবার চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

এই মর্মান্তিক গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বর্তমানে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে, যা জাঠিভাঙ্গার সেই ভয়াল ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইনের গণহত্যা

ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইনের সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত সাত জোড়া কবর আজও ১৯৭১ সালের বিভীষিকাময় স্মৃতি বহন করে চলেছে। সে সময় এখানে একটি কুঁড়েঘরে স্থাপিত মাদ্রাসা ছিল, যা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই এলাকায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে নিরীহ মানুষদের ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এই স্থানে এলাকার সমিরুদ্দীন, হাবিবুর রহমান, সাইফুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম, আবদুস সামাদ ও শামসুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত এই ভূমিতেই পরে তাঁদের দেহাবশেষ সমাহিত করা হয়। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সাত জোড়া কবর সংরক্ষণ বা চিহ্নিত করার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, ফলে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগুলো অবহেলার মধ্যেই পড়ে রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও সুগারমিল গণহত্যা

সুগারমিলের গার্ড জহুর হোসেন ও সিনিয়র ইলেকট্রিশিয়ান আসগর আলীকে পাকিস্তানি বাহিনী একত্রে গুলি করে হত্যা করে। মিলের মূল ফটকের পাশে তাঁদের জোড়া কবর রয়েছে।

বয়েন্ধা চৌধুরীপাড়ার গণহত্যা

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বয়েন্ধা চৌধুরীপাড়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একই পরিবারের সাতজন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ওই সময় বিহারিদের সক্রিয় সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই এলাকায় নিয়মিতভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করত। নিরীহ মানুষদের ধরে এনে নির্বিচারে হত্যা করা ছিল তাদের দৈনন্দিন সন্ত্রাসের অংশ।

ফাড়াবাড়ি হাটের বধ্যভূমি

ঠাকুরগাঁওয়ের ফাড়াবাড়ি হাটের বধ্যভূমি এলাকায় একটি কুয়া আজও ১৯৭১ সালের ভয়াবহতার নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে অবাঙালি বিহারিদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অন্তত ১৮ জন নিরীহ মানুষকে ধরে এনে এখানে গুলি করে হত্যা করে। হত্যার পর তাঁদের লাশ ওই কুয়ায় ফেলে দেওয়া হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বধ্যভূমিটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে আছে, সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

রুহিয়ার রামনাথ হাটের গণকবর

১৯৭১ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া এলাকা সদর থানার একটি ইউনিয়ন ছিল, যা বর্তমানে রুহিয়া থানা হিসেবে পরিচিত। রামনাথ হাটের কানিকশালগাঁ গ্রামের নুরুল ইসলামের পরিবারের ছয়জন সদস্যকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই ছয় শহীদ হলেন রফিকুল ইসলাম (আবুল), আজিম উদ্দিন আহমেদ, আজিম উদ্দিন আহমেদের নাতি মো. বেলাল (বেলু), তাঁর ছোট ভাই মো. জালাল, মো. রেজাউল এবং দেলোয়ার। তাঁদের স্মৃতিবাহী এই গণকবর সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

তেঁতুলতলা ফার্ম গণহত্যা

তৎকালীন পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগের নেতা ডা. সুজাউদ্দিন, আতাউর রহমান, আবদুল জব্বার ও মোজাফফর আলীসহ মোট সাতজন রাজনৈতিক নেতাকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে আসে পীরগঞ্জ–ঠাকুরগাঁও পাকা সড়কের তেঁতুলতলা ফার্মে এবং সেখানে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। শহীদদের মধ্যে ছিলেন জেলার একমাত্র শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত পীরগঞ্জ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা। শহীদ অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফার কবর পীরগঞ্জ রেলক্রসিং এলাকায় অবস্থিত হলেও সেটিও সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। তেঁতুলতলায় নির্মিত একটি নামমাত্র স্মৃতিস্তম্ভ অযত্নে পড়ে রয়েছে। শহীদ গোলাম মোস্তফার স্মরণে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ একটি বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল।

দেশিয়াপাড়া বধ্যভূমি

পীরগঞ্জ উপজেলার ভোমরাদহ ইউনিয়নের দেশিয়াপাড়া এলাকায় স্থানীয় শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে ধরে এনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা চালায়। হত্যার পর তাঁদের লাশ একটি বড় গর্তে একসঙ্গে মাটি চাপা দেওয়া হয়। কিন্তু এত বড় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনো স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়নি এবং বধ্যভূমিটি সংরক্ষণেরও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

বালিয়াডাঙ্গি বধ্যভূমি

বালিয়াডাঙ্গির মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং স্বাধীনতার পর ছয়বারের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলীর পিতা আকবর আলীকে পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি থেকে ডেকে এনে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। একই থানার ঝিকরগাছা গ্রামের আরও ২৫ জন নিরীহ মানুষকে বাড়ি থেকে ধরে এনে বালিয়াডাঙ্গি ক্যাম্পে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত গণকবরগুলো আজও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি

খুনিয়াদীঘির গণহত্যা পাকিস্তানি সেনাদের সংঘটিত বর্বরতম হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি। ঠাকুরগাঁও জেলায় এমন মানুষ পাওয়া যাবে না, যিনি খুনিয়াদীঘির নাম শোনেননি। রানীশংকৈল থানায় পাকিস্তানি সেনাদের একটি ক্যাম্প ছিল। রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় অসংখ্য বাঙালিকে ধরে এনে এখানে নির্যাতনের পর হত্যা করে খুনিয়াদীঘিতে ফেলে দেওয়া হতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তিন হাজারেরও বেশি বাঙালিকে হত্যা করে এই দিঘিতে নিক্ষেপ করা হয়েছে। খুব কম সংখ্যক লাশই মাটি খুঁড়ে গর্তে পুঁতে রাখা হতো। অনেক মরদেহ টাঙন নদীতেও ফেলে দেওয়া হয়। বর্তমানে রাণীশংকৈল উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি
খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি।

পীরডাঙ্গী বধ্যভূমি

পীরগঞ্জ উপজেলার পীরডাঙ্গী ১৯৭১ সালে বর্বর ও নৃশংস গণহত্যার এক ভয়াল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই এলাকাকে একটি স্থায়ী বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করত। স্বাধীনতার পর লাচ্ছি নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ জনমানবহীন এলাকায় অসংখ্য বাঙালির মাথার খুলি, বুকের পাঁজর, হাত-পায়ের হাড় এবং রক্তমাখা কাপড় পাওয়া যায়। হানাদারদের নির্মমতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে জীবিত মানুষদের শরীরের মাংস কেটে কুকুরকে খাওয়ানো হয়েছে। পেট্রোল ঢেলে মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হতো, গলা কেটে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা ছিল যেন তাদের কাছে এক ধরনের উৎসব।

ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষী এই বৃহৎ গণকবরটি আজও অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো চিহ্নিতকরণ বা খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বধ্যভূমিগুলোর অবস্থানও হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সাংবাদিক আজম রেহমানের মতে, সে সময় এখানে প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। পাশের গ্রামের আলাউদ্দিন জানান, তাঁর বাবা জামালউদ্দিনসহ একই পরিবারের আটজনকে এখানে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, ১৯৭১ সালে এক মায়ের চার সন্তান—জামালউদ্দিন আহমেদ, লতিফর রহমান, হাসান আলি ও আজিজুর রহমান—এই বধ্যভূমিতে শহীদ হন। অথচ এই গণকবর সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।

ইসলামনগর (খানকা শরীফ) বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের মে মাসে পাকিস্তানি সেনারা খানকা শরীফ নামে পরিচিত ইসলামনগর মহলটি ঘেরাও করে। আতঙ্কিত মানুষের কাছে ক্যাপ্টেন আফজাল ও ক্যাপ্টেন হারুন অর রশিদ জানতে চান, সর্বশেষ নির্বাচনে তারা কোন দলকে ভোট দিয়েছে। কয়েকজন নির্ভয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। কেন আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন—এই প্রশ্নের জবাব দেন স্থানীয় চিকিৎসক ডা. মোস্তফা আহম্মেদ। এরপর এক সেনা কর্মকর্তা একটি তালিকা বের করে কয়েকজনের নাম পড়ে শোনান এবং পরদিন সকাল দশটার মধ্যে ক্যাম্পে হাজির হতে নির্দেশ দেন। অন্যথায় পুরো মহল্লা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

খানকা শরীফ বধ্যভূমি
খানকা শরীফ বধ্যভূমি।

সারারাত আলোচনা ও পরামর্শের পর এলাকাবাসী সিদ্ধান্ত নেয়, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের ক্যাম্পে পাঠানো হবে। সেদিন কাউকে হত্যা না করায় তাঁদের ধারণা হয়েছিল, ক্যাম্পে কেবল জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যানবাহনের অভাবে পরদিন সকালে গরুর গাড়িতে করে সাতজন ইপিআর ক্যাম্পে হাজিরা দিতে যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন খানকা শরীফের পীর সাহেব মরহুম মো. শামসুজ্জোহার কনিষ্ঠ পুত্র ছাত্র আহম্মেদ হোসেন (১৯), ডা. মোস্তফা আহম্মেদের ছোট ভাই, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এসএমএ ইসলামুল হক (৫৫), মো. মাহাদি ওরফে দবিরউদ্দিন (৩২), সিরাজউদ্দিন আহম্মদ (৫৫), ইয়াকুব হোসেন (৪৫), মাজহারুল ইসলাম (৪৫) ও মো. নুরুজ্জামান (৩৬)।

ক্যাম্পে যাওয়ার পর তাঁদের কী হয়েছিল, তা বহুদিন খোঁজ করেও স্বজনরা জানতে পারেননি। পরে জানা যায়, ২৪ মে তাঁদের ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় টাঙন নদীর পুরোনো সেতুর কাছে একটি বধ্যভূমিতে এবং সেখানে আরও আটজনের সঙ্গে একত্রে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে সবাইকে মাটি চাপা দেওয়া হয়। ওই অতিরিক্ত আটজনকে বালিয়াডাঙ্গী থেকে ধরে আনা হয়েছিল, যাঁদের পরিচয় জানা যায়নি। অন্যান্য সূত্রেও উল্লেখ রয়েছে, পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে টাঙন নদীতে ফেলে দেয়। ইসলামনগরের খানকা শরীফের এই বধ্যভূমিটি বর্তমানে চিহ্নিত করে বাঁধানো করা হয়েছে, যা ১৯৭১ সালের নৃশংসতার এক জীবন্ত স্মারক।

সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার গণহত্যা ও বধ্যভূমি

সিলেট

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

সালুটিকর বধ্যভূমি

সিলেট জেলার অন্যতম বৃহৎ ও নৃশংস বধ্যভূমিগুলোর একটি অবস্থিত সালুটিকর এলাকায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এখানে অবস্থিত সিলেট ক্যাডেট কলেজকে একটি সামরিক ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। এই ক্যাম্পটি দ্রুতই পরিণত হয় নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের এক ভয়াবহ কেন্দ্রে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে এই ক্যাম্পে আটক রাখা হতো। বন্দিদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন, জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন এবং নির্মম অত্যাচার।

সালুটিকর বধ্যভূমি
সালুটিকর (ক্যাডেট কলেজ) বধ্যভূমি।

নির্যাতনের পর অনেককে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে হত্যা করা হতো। নিহতদের মরদেহ যথাযথভাবে দাফন না করে সিলেট ক্যাডেট কলেজের পেছনের নির্জন স্থানে গণকবর দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সূত্র অনুযায়ী, এই গণকবরগুলোতে দুই শতাধিক শহীদের দেহ সমাহিত রয়েছে। সালুটিকর বধ্যভূমি তাই শুধু একটি স্থান নয়, এটি পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের এক করুণ সাক্ষ্য। এই বধ্যভূমি সিলেট অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যার ইতিহাসে এক ভয়াল স্মারক হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

সিলেট হাসপাতাল বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে সিলেটে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণ শুরু হয়। তাদের গোলাবর্ষণ, মর্টার শেলিং এবং মেশিনগানের গুলিতে অসংখ্য মানুষ নিহত হন। যাঁরা এই আক্রমণে আহত হয়েছিলেন, তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন সিলেট হাসপাতালে। এই অসহায় আহত মানুষদের চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে তোলার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ডা. শামসুদ্দিন আহমদ। ৯ এপ্রিল সকালে পাকিস্তানি বাহিনী সিলেট হাসপাতালের চারদিক ঘিরে ফেলে। এ সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর রিয়াজ। সেনারা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রবেশ করে এবং ডা. শামসুদ্দিন আহমদ, ডা. শ্যামলকান্তি লালা, গাড়িচালক কোরবান আলী, মাহমুদুর রহমান এবং আরও সাতজন রোগীকে ধরে হাসপাতালের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁদের একে একে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের লাশ তিনদিন ধরে ওই স্থানে পড়ে থাকে। পরে স্থানীয় কিছু মানুষ সাহস করে এগিয়ে এসে সেই স্থানেই তাঁদের কবর দেন।

মির্জা জাঙ্গাল বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সিলেটে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মির্জা জাঙ্গালের নিম্বার্ক আশ্রমে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে তারা রাসবিহারী ধর ও পাঁচু বাবুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরদিন ২৮ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী পুনরায় নিম্বার্ক আশ্রমে হানা দেয় এবং সুরতি ধর ও নরেন্দ্র দেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ১০ এপ্রিল অধ্যক্ষ কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরীকে ধরতে না পেরে, তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন করম খান আশ্রয়দাতা পদ্মকেশ চৌধুরীর ভাই ব্যোমকেশ চৌধুরীকে হত্যা করে। ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানি বাহিনী মির্জা জাঙ্গালে অবস্থিত ডা. দিগেন্দ্রকুমার এন্দের বাড়িতে আক্রমণ চালায় এবং মর্টার নিক্ষেপ করে। এতে একই পরিবারের ডা. দিগেন্দ্রকুমার এন্দ, তাঁর স্ত্রী সুনীতি বালা এন্দ, পুষ্পা এন্দ, দিব্যেন্দ এন্দ, শিখা এন্দ, অপু এন্দ, শিবানী এন্দ এবং গোপেশ দাস নিহত হন। এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনী মির্জা জাঙ্গালের ব্যবসায়ী খসরুজ্জামানসহ আরও চারজনকে গুলি করে হত্যা করে।

কলাপাড়া বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল বিকেল তিনটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বিশাল বহর কলাপাড়া বস্তিতে প্রবেশ করে। তারা এলাকার সব নর-নারীকে তাদের স্থাপিত তাঁবুতে হাজির হতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই আহ্বানে কোনো বাঙালি সাড়া না দিলে পাকিস্তানি বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা লোকজনকে ধরে এনে কলাপাড়ার একটি বাড়ির সামনে জড়ো করে এবং তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এরপর নির্যাতিত মানুষদের হিন্দু ও মুসলমান—এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। মুসলমানদের মুক্তি দিয়ে হিন্দুদের ধরে একটি টিলার ওপর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় যাঁরা শহীদ হন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কালিয়া উড়িয়া, নকুল উড়িয়া, সধ্ব উড়িয়া, বীর উড়িয়া, বেণী উড়িয়া, নিতাই উড়িয়া, রমণ উড়িয়া, ছকু উড়িয়াসহ আরও অনেকে।

আখালি বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সিলেটের আখালি এলাকায় প্রবেশ করে। তারা মদিনা মার্কেটে একটি সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করে এবং সেখান থেকেই শুরু করে গণহত্যা। মদিনা মার্কেটে নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে মানিক মিয়া, একজন রিকশাচালক, এক বৃদ্ধলোকসহ আরও অনেকে নিহত হন। এরপর ১০ এপ্রিল নোয়াপাড়া গ্রামের আব্দুছ সাত্তার ও আবদুর রাজ্জাককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৩ এপ্রিল আড়িখাই গ্রামের সুশীল চন্দ্র ঘোষকে এবং ২৫ এপ্রিল কলাপাড়ার পুলিন চন্দ্র দেবকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আখালি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক লুটতরাজ, গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালায়।

কালাগুল চা বাগান বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কালাগুল চা বাগানে প্রবেশ করে এবং বাগানের ব্যবস্থাপকের বাংলোতে আস্তানা গড়ে তোলে। পাকিস্তানি সেনাদের আগমনের সংবাদ পেয়ে চা বাগানের শ্রমিকেরা পালানোর চেষ্টা করেন। কেউ কেউ পালাতে সক্ষম হলেও অনেক শ্রমিক ধরা পড়ে যান। ধৃত শ্রমিকদের সবাইকে একত্র করে কালাগুল চা বাগানের কাঁঠালতলি এলাকায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন কালোগুনা লোহার, কোষ লোহার, লালবান খাটুয়ার, সাধু বাউরি, তুফান লোহার, গোলক লোহার, ভুবন লোহার, ভীম লোহার ও মিঠাই লোহারসহ অন্তত ১৫ জন শ্রমিক। নিহতদের মৃতদেহ সেখানে যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়।

স্টার চা বাগান বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী স্টার চা বাগানে প্রবেশ করে। এই চা বাগানের মালিক ছিলেন রাজেন্দ্রলাল গুপ্ত। পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলে তারা একসঙ্গে শ্রমিকদের রাজেন্দ্রলাল গুপ্তের বাড়ির সামনে জড়ো করে। এরপর সবাইকে পার্শ্ববর্তী মালনীছড়া চা বাগানের একটি টিলার পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মালিক, কর্মচারী ও শ্রমিক—এই তিন ভাগে সবাইকে বিভক্ত করা হয়। টিলার তিন পাশ ঘিরে তিনজন সুবেদারের নেতৃত্বে তিনটি আলাদা দল গঠন করে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মোট ৩৯ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন রাজেন্দ্রলাল গুপ্ত, রবীন্দ্রনাথ গুপ্ত, জহরলাল গুপ্ত, ক্ষিতীশ চন্দ্র দে, নরেশ চন্দ্র দেব, ফটিক রায় হালদার, ভারত ভল্লার, মহেন্দ্র কোরামোদী, পালেশ করোমোদীসহ আরও অনেকে। এছাড়া ৫ ও ৬ মে পুনরায় পাকিস্তানি বাহিনী স্টার চা বাগানে প্রবেশ করে আরও চারজনকে গুলি করে হত্যা করে।

গোয়ালাবাজার বধ্যভূমি

আওয়ামী লীগের গোয়ালাবাজার ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান চৌধুরী, গদিয়ার চর গ্রামের আবদুল মনাফ এবং মোড়লদাশ গ্রামের তোতা মিয়াকে পাকিস্তানি বাহিনী আটক করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়া পাকিস্তানি সেনারা গোয়ালাবাজারের পূর্ব দিকের হাওরে অজ্ঞাতপরিচয় দুইজন, তাপেশ লাল ও নয়ান শুক্লা বৈদ্যকে গুলি করে হত্যা করে।

সাদিপুর বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী সিলেটের সাদিপুর গ্রামে প্রবেশ করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় মাসুক আহমদ নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে যাকে পায় তাকেই বন্দি করে ধরে নিয়ে যায় সাদিপুর ফেরিঘাটে। সেখানে রশি দিয়ে বেঁধে তাঁদের নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় আলী বক্স, বেটু মিয়া, টেনাই মিয়া, তরণী চন্দ্র বৈদ্য, খয়ের উদ্দিন চৌকিদার ও লদইসহ আরও অনেকে শহীদ হন। সাদিপুর গ্রামে হামলার সময় নিরস্ত্র ও অসহায় গ্রামবাসীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পলায়নপর অবস্থাতেই কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন টেনাই উল্লাহ, সুলতান উল্লাহ, সাধু মিয়া, সৈয়দ আনসার আলী, করম উল্লাহসহ আরও অনেকে।

অন্যান্য বধ্যভূমি

উপরোক্ত বধ্যভূমিগুলোর পাশাপাশি সিলেট জেলায় আরও অসংখ্য বধ্যভূমি রয়েছে, যেখানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মম গণহত্যা চালায়। উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে রয়েছে আবহাওয়া অফিস বধ্যভূমি, সুরিকোনা বধ্যভূমি, বারুতখানা বধ্যভূমি, টুলটিকর বধ্যভূমি, মছকন্দের খাল বধ্যভূমি, জৈন্তাপুর বধ্যভূমি, খরিসের পুল বধ্যভূমি, গোয়াইন নদী বধ্যভূমি, মডেল স্কুল বধ্যভূমি, জ্ঞানবাবুর বাড়ি, খাজাঞ্চি বাড়ি, মহাজান পট্টি, সিলেটের এমসি কলেজ বধ্যভূমি এবং সিলেট বিমানবন্দর বধ্যভূমি।

সুনামগঞ্জ

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

সুনামগঞ্জ জেলার আটটি উপজেলায় বর্তমানে মোট ১১টি বধ্যভূমি চিহ্নিত অবস্থায় রয়েছে। তবে এর বাইরেও যথাযথ উদ্যোগ, গবেষণা ও অনুসন্ধানের অভাবে আরও অনেক বধ্যভূমি আজও আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বহু গণহত্যাস্থল ইতিহাসের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। অথচ এসব বধ্যভূমি মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত আত্মত্যাগ, বীরত্ব ও জাতির গৌরবময় ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য বহন করে।

শ্রীরামসি বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা শ্রীরামসি গ্রামে শান্তি কমিটি গঠনের নামে একটি ভয়ংকর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে। শান্তি ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে গ্রামবাসীদের ডেকে পাঠানো হয় গ্রামের স্কুল মাঠে। বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত মানুষজন মনে করেছিলেন, এটি হয়তো প্রশাসনিক কোনো বৈঠক কিংবা নতুন কোনো নির্দেশনা জানানো হবে। কিন্তু সেই ধারণা যে কতটা ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে, তা তখন কেউই কল্পনা করতে পারেননি।

শ্রীরামসি বধ্যভূমি, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ
শ্রীরামসি বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

স্কুল মাঠে জড়ো হওয়ার পর নারী–পুরুষ নির্বিশেষে গ্রামবাসীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনারা ও তাদের সহযোগীরা নির্মমভাবে ব্রাশফায়ার শুরু করে। গুলির শব্দে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, আর একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকেন নিরীহ মানুষজন। এই পরিকল্পিত গণহত্যায় শিক্ষক, তহশীলদারসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সম্মানিত ব্যক্তিরা এবং অসংখ্য সাধারণ গ্রামবাসী নির্মমভাবে শহীদ হন। শান্তি কমিটি গঠনের নামে সংঘটিত এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ পুরো এলাকাকে শোক ও আতঙ্কে স্তব্ধ করে দেয়। যাঁরা প্রাণে বেঁচে যান, তাঁদের মনে আজও সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি দগদগে হয়ে রয়েছে। শ্রীরামসি গ্রামের এই গণহত্যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও প্রতারণার এক জ্বলন্ত প্রমাণ, যা ইতিহাসের পাতায় গভীর বেদনার সঙ্গে লেখা হয়ে আছে।

রানিগঞ্জ বাজার বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি হানাদার সেনারা পরিকল্পিতভাবে রানিগঞ্জ বাজার এলাকা ঘেরাও করে ফেলে। হঠাৎ এই ঘেরাওয়ে বাজারে উপস্থিত মানুষজন দিশেহারা হয়ে পড়েন। কোনো রকম সতর্কতা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই সেনারা দুই শতাধিক নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হাত বেঁধে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। অনেকেই তখনো বুঝে উঠতে পারেননি, তাঁদের সামনে কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।

রানিগঞ্জ বাজার বধ্যভূমি, সুনামগঞ্জ
রানিগঞ্জ বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, সুনামগঞ্জ। ছবিটি বাংলা ট্রিবিউন থেকে সংগৃহীত।

এরপর মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো মানুষগুলোর ওপর। গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে, আর একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অসংখ্য নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষ। চোখের পলকেই প্রাণ হারান বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতা, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। এই আকস্মিক ও নৃশংস গণহত্যা রানিগঞ্জ বাজারকে মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে। যাঁরা অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের মনে আজও সেই দিনের বিভীষিকাময় স্মৃতি গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। রানিগঞ্জ বাজারের এই গণহত্যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার আরেকটি মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ছাতক বধ্যভূমি

২৮ এপ্রিল ছাতকে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় বহু মানুষ শহীদ হন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর দেশকে হানাদারমুক্ত করার সংকল্প নিয়ে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৮ জন উদ্যমী যুবক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সমবেত হন। তাঁরা সুনামগঞ্জের ছাতকের নোয়ারাই এলাকার সুরমা নদী হয়ে ভারতের চেলায় ট্রেনিংয়ের জন্য রওনা দেন। নোয়ারাইয়ের বেতুরা এলাকা দিয়ে পথ অতিক্রমের সময় এই এলাকার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রাজাকার স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান মতছির আলী ওরফে ফকির চেয়ারম্যান এ খবর পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে যুবকদের তার বাড়িতে নিয়ে যায়। তার মিষ্টি কথায় সরল বিশ্বাসে যুবকরা ট্রেনিংয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু সেই সময় ফকির চেয়ারম্যান তাদের ভারত না নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীকে খবর দিয়ে এনে টগবগে যুবকদের পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তোলে দেয়।

নোয়ারাইয়ের বেতুরা এলাকা অতিক্রম করার সময় ওই অঞ্চলে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী কুখ্যাত রাজাকার ও স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান মতছির আলী ওরফে ফকির চেয়ারম্যান এই খবর পেয়ে যায়। যুবকদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এবং বিশ্বাস অর্জনের জন্য কৌশলে সে তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। তার মিষ্টভাষী কথাবার্তা ও ভ্রান্ত আশ্বাসে সরল বিশ্বাসে যুবকরা সেখানে অবস্থান করে প্রশিক্ষণে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক ফকির চেয়ারম্যান তাদের ভারতে পাঠানোর পরিবর্তে গোপনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে খবর দেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পাক বাহিনী সেখানে এসে দেশমাতৃকার মুক্তির স্বপ্নে উজ্জ্বল সেই টগবগে যুবকদের নিজেদের কবলে তুলে নেয়।

শিখা সতেরো, সুনামগঞ্জ
শিখা সতেরো স্মৃতিসৌধ, সুনামগঞ্জ।

যুবকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের হাত-পা শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয় এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ছাতক থানায় নিয়ে যায়। পরদিন সন্ধ্যাবেলায় তাদের ছাতক–গোবিন্দগঞ্জ সড়কের লালপুল নামক নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় কয়েকজন মানুষকে দিয়ে একটি বড় গর্ত খনন করানো হয়। এরপর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ সেই যুবকদের ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন—শারীরিক ও মানসিক কষ্টের এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তাদের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো এলাকাকে ভারী ও স্তব্ধ করে তোলে।

হঠাৎ করেই গর্জে ওঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মেশিনগান। মুহূর্তের মধ্যে লালপুল এলাকার সবুজ ঘাস তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। গুলিবর্ষণের পরও অনেক যুবকের মৃত্যু নিশ্চিত না হলেও নির্মমভাবে তাদের টেনে-হিঁচড়ে সেই গর্তের ভেতরে নিক্ষেপ করা হয়। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জীবন্ত ১৭ জন দামাল যুবককে নির্দয়ভাবে মাটিচাপা দিয়ে নরপশু হানাদার ও তাদের দোসররা উল্লাসে মেতে ওঠে। পরদিন রাতে গ্রামের কিছু সাহসী মানুষ চুপিসারে এসে রক্তাক্ত দেহগুলোর ওপর আরও মাটি চাপা দেন।

এইভাবেই দেশের আরও ১৭ জন সূর্যসন্তানের জন্য এখানে রচিত হয় এক জীবন্ত সমাধি—এক বিভীষিকাময় গণকবর। ইতিহাসের পাতায় ও ছাতকসহ সমগ্র দেশের মানুষের স্মৃতিতে এই স্থান আজও গভীর শ্রদ্ধা ও বেদনায় পরিচিত হয়ে আছে ‘শিখা সতেরো’ নামে।

গাজীপুরের সাগরদিঘী বধ্যভূমি

২ মে গাজীপুর গ্রামের সাগরদিঘীর পাড় এক ভয়াবহ গণহত্যার নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়। ওই দিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে এলাকাটিকে বধ্যভূমিতে রূপান্তর করে। নিকটবর্তী নালুয়া চা বাগান থেকে ধরে আনা ২০ থেকে ২৫ জন নিরস্ত্র ও নিরীহ শ্রমিককে অমানুষিক নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে লিপ্ত এসব শ্রমিকদের অপরাধ ছিল একটিই—তারা ছিল বাঙালি এবং মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীর অংশ।

হত্যাকাণ্ডের পর তাদের রক্তাক্ত দেহগুলো গাজীপুর গ্রামের সাগরদিঘীর পাড়ের পাশে অবস্থিত একটি কূপে নির্বিকারভাবে ফেলে দেওয়া হয়, যেন কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট না থাকে। কূপের অন্ধকার গভীরে চাপা পড়ে যায় একাধিক জীবনের আর্তনাদ, শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন, পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ এবং একটি জনপদের আশা।


দুঃখজনক হলেও সত্য, চিহ্নিত বধ্যভূমিগুলোকেও সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও তদারকির অভাবে এসব ঐতিহাসিক স্থান ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন। স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে কোনো কোনো বধ্যভূমিতে নামফলক স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ স্থানই চরম অবহেলায় পড়ে আছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এই অবহেলা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ ও ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে।

দিনাজপুর ও নীলফামারীর বধ্যভূমি ও মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১

দিনাজপুর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় শুধু গণহত্যার সংখ্যাই দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭২৬টি। এ ছাড়া বধ্যভূমি ৩২টি, গণকবর ৩৪টি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর ১০টি এবং নির্যাতন কেন্দ্রের সংখ্যা পাওয়া গেছে প্রায় ৬৫টি। যার অধিকাংশই এখনো অরক্ষিত।

হোম সিগন্যাল বধ্যভূমি, পার্বতীপুর

পার্বতীপুর রেলস্টেশন থেকে আনুমানিক কয়েক শ গজ উত্তরে অবস্থিত হোম সিগন্যাল এলাকা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক নৃশংস স্মারক। এই স্থানে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই একটি বৃহৎ গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়, যা তৎকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সংঘটিত বর্বর গণহত্যার নীরব সাক্ষ্য বহন করে।

মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস জুড়ে পাকিস্তানি সেনারা পার্বতীপুর ও আশপাশের গ্রামাঞ্চল থেকে স্বাধীনতাকামী নারী ও পুরুষদের ধরে এনে প্রথমে নির্মম নির্যাতন চালাত এবং পরবর্তীতে তাদের হত্যা করে এই এলাকায় মাটিচাপা দিত। রেললাইনের নিকটবর্তী হওয়ায় স্থানটি সেনাদের জন্য গোপন হত্যাকাণ্ড পরিচালনার একটি সুবিধাজনক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

এই বধ্যভূমিতে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী সতীশ সরকার (মনুদা), ব্যাংক কর্মকর্তা সজিরুদ্দিন, দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যাপক ওয়াহিদুর রহমান, ওয়াপদার প্রকৌশলী ওবায়দুল হক এবং চিকিৎসক এম. এ. জব্বার। তাঁদের সঙ্গে আরও বহু নাম না-জানা সাধারণ মানুষও এখানে জীবন বিসর্জন দেন।

স্টেশন এলাকা বধ্যভূমি, পার্বতীপুর

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পার্বতীপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম বৃহৎ ও ভয়াবহ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন হওয়ায় পার্বতীপুর স্টেশন এলাকাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সেনারা একটি সুসংগঠিত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্র স্থাপন করেছিল।

বিভিন্ন গবেষণা, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই স্টেশন এলাকায় প্রায় বিশ হাজার নিরীহ বাঙালি নারী ও পুরুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা স্বাধীনতাকামী মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের এখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো।

রেললাইন, গুদামঘর ও পরিত্যক্ত স্থাপনাগুলোর আশপাশে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ড অনেক সময় রাতের আঁধারে চালানো হতো, যাতে প্রমাণ গোপন রাখা যায়। নিহতদের অনেককে এখানেই গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয় অথবা রেলপথ ব্যবহার করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়।

সেতাবগঞ্জ থানা বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতাবগঞ্জ থানা এলাকা, বিশেষ করে সেতাবগঞ্জ চিনিকলকে কেন্দ্র করে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের দ্বারা পরিচালিত একটি ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক স্থাপনার উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে এই এলাকাকে একটি অস্থায়ী আটক ও নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল।

পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক এবং আশপাশের সাধারণ মানুষকে ধরে এনে প্রথমে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাত এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে হত্যা করত। এসব হত্যাকাণ্ডের একটি বড় অংশ সংঘটিত হতো সেতাবগঞ্জ থানা উন্নয়ন কেন্দ্রের আশপাশে এবং সংলগ্ন সড়ক এলাকায়, যেখানে নিহতদের অনেককে গণকবর দেওয়া হয় বা গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

এছাড়াও বিরল, কাহারোল ও বীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ধরে আনা সন্দেহভাজন বাঙালি স্বাধীনতাকামীদের সেতাবগঞ্জে এনে হত্যা করা হতো। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমজীবী মানুষ এবং নিরপরাধ গ্রামবাসীরাও ছিলেন। এই বধ্যভূমি অঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘদিন আতঙ্কের মধ্যে রাখে এবং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পিত দমন–পীড়নের একটি স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

বাড়াই আখিরা গ্রাম বধ্যভূমি, ফুলবাড়ী

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বাড়াই আখিরা গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এক ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। ওইদিন শতাধিক নিরস্ত্র ও নিরপরাধ গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করা হয়, যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাড়াই আখিরা গ্রামকে একটি শোকাবহ ও স্মরণীয় বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে।

পাকিস্তানি বাহিনীর লাগাতার আক্রমণ, লুটপাট ও নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের বহু মানুষ তখন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেই পালানোর মুহূর্তেই তাঁদের লক্ষ্য করে অতর্কিতভাবে গুলি চালানো হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ নানা বয়সের মানুষ এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হন, যাঁদের অধিকাংশই আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ পাননি।

ব্রাশফায়ারে নিহতদের অনেককে ঘটনাস্থলেই ফেলে রাখা হয় এবং পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে গণকবর দেওয়া হয়। বাড়াই আখিরা গ্রাম বধ্যভূমি পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের এক নির্মম নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত।

নবাবগঞ্জ ও চড়ারহাট গণকবর

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার চকদুলু এলাকায় সংঘটিত হয় এক ভয়াবহ গণহত্যা। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এই এলাকায় প্রায় ২৫০ জন শহীদের একটি বৃহৎ গণকবর রয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষকে ধরে এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এখানে মাটিচাপা দেয়।

চড়ারহাট গণকবর, দিনাজপুর
চড়ারহাট গণকবর, দিনাজপুর।

এছাড়াও একই উপজেলার চড়ারহাট ও আন্দোল গ্রামে ১০ অক্টোবর ১৯৭১ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ চালায়। এই হামলায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ১৫৭ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। এই হত্যাযজ্ঞ পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নামিয়ে আনে এবং দিনাজপুর অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যার একটি ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।

নবাবগঞ্জ ও চড়ারহাট গণকবরগুলো আজ স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের নীরব স্মৃতিবাহী স্থান। এগুলো পাকিস্তানি বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রত্যক্ষ প্রমাণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যান্য বধ্যভূমি (দিনাজপুর)

দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধকালে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যা এই অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক গণহত্যার প্রমাণ বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো—বিরল উপজেলার বেহালা এলাকা, চিরিরবন্দর, হিলি, রামসাগর, গোদাগাড়ী, টেলিফোন ভবন এলাকা, টিকরামপুর, কাঞ্চন নদীর তীরবর্তী অঞ্চল, পার্বতীপুর বয়লার এলাকা এবং পালপাড়া গ্রাম।

এসব স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরেরা সাধারণ গ্রামবাসী, মুক্তিযোদ্ধা ও সন্দেহভাজন স্বাধীনতাকামী মানুষকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করত। অনেক ক্ষেত্রে নিহতদের গণকবর দেওয়া হয় কিংবা নদী ও জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এসব বধ্যভূমি দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গভীর বেদনা ও ত্যাগের সাক্ষ্য বহন করে।

নীলফামারী

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

সৈয়দপুর গোলাহাট বধ্যভূমি, নীলফামারী

সৈয়দপুর শহরের কাছাকাছি “গোলাহাট” নামে একটি স্থান ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়াবহ গণহত্যার কেন্দ্র। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার/বিহারীরা সৈয়দপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, জমিদার ও সংখ্যালঘু মানুষদের ৭ এপ্রিল তাঁদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের সেনানিবাসে রাখা শুরু করে। সংগঠিতভাবে দুই মাস ছয়দিন ধরে তাদেরকে নানান রকমের নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয়েছিল। অবশেষে ১৩ জুন দুপুরের পর্বে তাঁদের সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

সৈয়দপুর গোলাহাট বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ও নামফলক, নীলফামারী
সৈয়দপুর গোলাহাট বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ও নামফলক, নীলফামারী।

তাদেরকে ভারতে পাঠানোর কথা বলে ট্রেনে তুলে মাত্র প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে “গোলাহাট” এলাকায় ট্রেন থামানো হয়। ট্রেনের চারপাশে পাকসেনা, পুলিশ ও তাদের স্থানীয় সহযোগী বাহিনী পাহারা দেবে। নিরীহ মানুষগুলোকে গুলি চালিয়ে ও তরবারি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গণহত্যার সময় হত্যাকারীরা "খরচাখাতা, খরচাখাতা" বলে চিৎকার করছিলেন। "অপারেশন খরচাখাতা" ছিল পাকিস্তানি সেনা, বিহারি ও রাজাকারদের পূর্ব পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের নাম।পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী বিহারিরা কোনো রকম দয়া দেখায়নি; নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে সবাইকে বীভৎসভাবে হত্যা করে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর গোলাহাট বধ্যভূমি থেকে শহীদদের হাতের ব্যবহার্য অনেক বস্তু উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৬ ডিসেম্বর ২০১১ সালে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে গোলাহাটে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় এবং পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।

অনেক ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, সৈয়দপুর রেলস্টেশনের কাছে ১৩ জুন ১৯৭১-এ প্রায় ৪৫০-এরও বেশি সংখ্যালঘু মারোয়াড়ি সম্প্রদায়ের মানুষকে ভারতে পৌঁছানো হবে বলে ট্রেনে উঠিয়ে আগে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ট্রেনটি গোলাহাটে থামার পর তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর ফলে বহু নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশু শহীদ হন। অনেকেই সেই ভয়াবহ মুহূর্ত চোখের সামনে দেখে; কেউ কেউ জীবনের জন্য লাফ দিয়ে পালাতে সক্ষম হলেও অধিকাংশের মৃত্যু ঘটে।

টেকনিক্যাল স্কুল বধ্যভূমি, সৈয়দপুর

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সৈয়দপুরের টেকনিক্যাল স্কুল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম ভয়ংকর নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তখন আর জ্ঞানচর্চার স্থান ছিল না; বরং তা ব্যবহৃত হয়েছিল পরিকল্পিত হত্যা এবং নারীদের ওপর সংঘটিত নৃশংস নির্যাতনের ঘাঁটি হিসেবে।

১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—মেজর গুল, মেজর জাভেদ বখতিয়ার ও কর্নেল শফির নেতৃত্বে—সৈয়দপুর শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ মানুষদের জোরপূর্বক ধরে এনে এই টেকনিক্যাল স্কুলে আটক করে। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রকৌশলী ফজলুর রহমান, তাঁর ভাই রফিকুল ইসলাম, ভাগনে আনোয়ার হোসেন এবং রুহুল আমিন। আটক করার পরই তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এখানেই থেমে থাকেনি হানাদারদের বর্বরতা। ফজলুর রহমানের স্ত্রীসহ প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ জন নারীকে এই স্কুল প্রাঙ্গণে বন্দি করে রাখা হয়। দিনের পর দিন তাদের ওপর চালানো হয় অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। টেকনিক্যাল স্কুল বধ্যভূমি তাই শুধু একটি হত্যাস্থল নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত নারীনির্যাতনের এক ভয়াবহ ও কলঙ্কজনক স্মারক হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।

জলঢাকা গণহত্যা (কালিগঞ্জ বধ্যভূমি)

কালীগঞ্জ বধ্যভূমি তোরণ, নীলফামারী
কালীগঞ্জ বধ্যভূমি তোরণ, নীলফামারী।

১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার গোলনা ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক গণহত্যা। জীবন রক্ষার আশায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বালাগ্রাম ইউনিয়নের নিরীহ গ্রামবাসীরা এই এলাকায় এসে পৌঁছালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ওপর অতর্কিত ও পরিকল্পিত হামলা চালায়।

কালীগঞ্জ বধ্যভূমি নামফলক, নীলফামারী
কালীগঞ্জ বধ্যভূমি নামফলক, নীলফামারী।

নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এবং নানা উপায়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। এই বর্বর হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৩০০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারান। জলঢাকার কালিগঞ্জ বধ্যভূমি তাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার এক মর্মান্তিক নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নৃশংস গণহত্যা

১৯৭১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ এপ্রিল—এই তিন দিনে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস গণহত্যা। এই সময়কালে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সৈয়দপুর শহরের সাধারণ মানুষ এবং আশপাশের গ্রাম থেকে ধরে আনা প্রায় ৩৫০ জন নিরীহ মানুষকে পরিকল্পিতভাবে কারখানার ভেতরে হত্যা করা হয়।

এই গণহত্যায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল বদর, স্থানীয় বিহারী সহ অন্যান্যরা এক অভিনব ও ভয়ংকর পদ্ধতি ব্যবহার করে। রেলওয়ে কারখানায় ব্যবহৃত তিনটি বিশাল আকারের বয়লার ও ফার্নেসের ভেতরে জীবিত মানুষদের নিক্ষেপ করা হয়। সাধারণত লোহা গলানোর কাজে ব্যবহৃত এসব বয়লার ও ফার্নেসে নিক্ষিপ্ত মানুষের দেহ মুহূর্তের মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়, ফলে তাদের দেহাবশেষের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকেনি।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা নৃশংস গণহত্যায় ব্যবহৃত চুল্লি ও রেলওয়ে শেড, নীলফামারী
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা নৃশংস গণহত্যায় ব্যবহৃত চুল্লি ও রেলওয়ে শেড, নীলফামারী।

এই তিন দিনের বর্বর গণহত্যার নেতৃত্ব দেয় অবাঙালি মতিন হাশমি, মো. হব্বু, মো. জাহিদসহ রেলওয়ে কারখানার আরও বহু অবাঙালি কর্মচারী। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেদিন অসংখ্য নিরীহ ও নিরপরাধ বাঙালি আর্তচিৎকার করে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকরা তাদের সেই কাকুতি-মিনতি উপেক্ষা করে নির্বিকারভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায়।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার এই গণহত্যা পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের অমানবিক নিষ্ঠুরতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ, যা আজও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গভীর শোক ও ঘৃণার স্মারক হয়ে আছে। (সূত্র: ভোরের কাগজ, ১২ মার্চ ২০১৭)

রংপুর ও কুড়িগ্রামের বধ্যভূমি ও মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১

রংপুর জেলার বধ্যভূমি ও ইতিহাস

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

ঘাঘট নদীর তীর বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর শহর ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৩তম ব্রিগেডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদর দপ্তর। সামরিক উপস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে শুরু থেকেই দমন–পীড়ন ও সহিংসতার মাত্রা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ২৩ মার্চ লে. আব্বাসের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, যা অল্প সময়ের মধ্যেই গণহত্যায় রূপ নেয়।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ মার্চ ১৯৭১ তারিখে হাজারো নিরস্ত্র মানুষ ঘাঘট নদীর তীরবর্তী এলাকায় জমায়েত হয়। তারা মূলত প্রতিবাদ ও আতঙ্কের মধ্যে নিজেদের অবস্থান জানাতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রকার সতর্কতা বা উসকানি ছাড়াই পাকিস্তানি সেনারা ওই জনসমাবেশের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

এই নির্মম হামলায় অসংখ্য নারী–পুরুষ ও তরুণ প্রাণ হারান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, নিহতদের রক্তে ঘাঘট নদীর পানি লাল হয়ে উঠেছিল—যা এই হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে আছে। গুলিবর্ষণের পর বহু মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বা তীরবর্তী এলাকায় ফেলে রাখা হয়, ফলে ঘাঘট নদীর তীর এক বৃহৎ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়।

নাবিরহাট বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর অঞ্চলের নাবিরহাট এলাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অনুসন্ধান অনুযায়ী, নাবিরহাট ও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে ধরে আনা মানুষদের এখানে এনে হত্যা করা হতো। নিহতদের মধ্যে গ্রামবাসী, শ্রমজীবী মানুষ এবং সন্দেহভাজন স্বাধীনতাকামী ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে হত্যার পর মরদেহগুলো আশপাশের খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয় অথবা গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত নিশবেতগঞ্জ বধ্যভূমি সংলগ্ন এলাকা, রংপুর
ঘাঘট নদীর তীরে অবস্থিত নিশবেতগঞ্জ বধ্যভূমি সংলগ্ন এলাকা, রংপুর।

রংপুর সেনানিবাস গণকবর

রংপুর সেনানিবাসের নিকটবর্তী এলাকাটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এক বিভীষিকাময় হত্যাক্ষেত্রে পরিণত হয়। এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও বাঙালি ইপিআর সদস্যসহ প্রায় ২০০ জন দেশপ্রেমিক সৈনিক ও নিরস্ত্র মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে গণকবর দেয়। স্বাধীনতার পর স্থানীয়দের তথ্য ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায় এবং প্রায় ১০ হাজার শহীদের দেহাবশেষ বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার করা হয় বলে জানা যায়। ১২ এপ্রিল সৈয়দপুর এলাকা থেকে বহু মাড়োয়ারি নাগরিককে ধরে এনে হত্যা করার পর তাদের লাশও এই এলাকাতেই পুঁতে রাখা হয়েছিল। এই গণকবর আজও সেই নৃশংসতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রংপুর সেনানিবাস বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, রংপুর
রংপুর সেনানিবাস বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, রংপুর।

জাফরগঞ্জ পুল বধ্যভূমি

জাফরগঞ্জ পুল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভয়াবহ হত্যাস্থলে পরিণত হয়। সেতুটির আশপাশের নির্জন পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে হানাদাররা এখানে বন্দীদের এনে হত্যা করত। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে অন্তত ১০ জন নিরীহ মানুষকে এই সেতুর কাছেই গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এলাকাবাসীর সাক্ষ্য থেকে এই স্থানটির ভয়াবহ ইতিহাস প্রকাশ পায়।

নিশবেতগঞ্জ বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধে কেবল এই একটি গ্রামেই ১টি বা২টি নয়, ১৮টি বধ্যভূমি ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একদিনে সর্ববৃহৎ বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিলো এই রংপুরের নিসবেতগঞ্জ গ্রামেরই বালাইরখালে নামক স্থানে। নিশবেতগঞ্জ সেতু সংলগ্ন এলাকা ছিল রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞের আরেকটি নির্মম স্মারক। একাত্তরের ১২ই এপ্রিল রাতে একসঙ্গে ৫০ জনেরও বেশী বুদ্ধিজীবীকে টানা ১৮দিন নির্যাতনের পর ব্রাশফায়ার করে হ'ত্যা করেছিলো পাকিস্তানীরা। এদের মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক, শিক্ষক, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতা, সমাজসেবক সহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। স্বাধীনতার পর এই এলাকায় মানুষের খুলি ও কঙ্কাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়, যা প্রমাণ করে এখানে কতটা বর্বরতা সংঘটিত হয়েছিল। পীরগঞ্জের তহশিলদার আহমদ আলী প্রত্যক্ষভাবে বহু মানুষকে এখানে হত্যা হতে দেখেছেন বলে জানান। বিশেষ করে ১ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে ধারাবাহিকভাবে ১২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়—এমন সাক্ষ্যও পাওয়া যায়।

বৈরাগীগঞ্জ বধ্যভূমি

বৈরাগীগঞ্জ এলাকাও পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি। এখানে বহু নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে এনে হত্যা করা হয়। যদিও এই স্থানের নির্দিষ্ট ঘটনার সংখ্যা অজানা, তবুও স্থানীয় স্মৃতিচারণ ও প্রমাণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃত।

দমদমা সেতু বধ্যভূমি

কারমাইকেল কলেজ থেকে প্রায় দুই মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত দমদমা সেতুর নিচে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি বধ্যভূমি গড়ে ওঠে। এখানে নিয়মিতভাবে বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করা হতো। ৩০ এপ্রিল শিক্ষক রামকৃষ্ণ অধিকারী, কালাচাঁদ রায়, সুনীলবরণ চক্রবর্তী, চিত্তরঞ্জন রায়সহ বহু শিক্ষিত ও সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্থানটি ছিল এক স্থায়ী মৃত্যুকূপের মতো, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতো।

দমদমা সেতু বধ্যভূমি, রংপুর
দমদমা সেতু বধ্যভূমি, রংপুর।

বলদিপুকুর বধ্যভূমি

বলদিপুকুর এলাকাও পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়। এখানে বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে গোপনে লাশ ফেলে রাখা বা পুঁতে ফেলা হয়েছিল। স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত স্মৃতিতে এই স্থানটি এক বেদনাবিধুর হত্যাক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত।

দখিগঞ্জ শ্মশানঘাট বধ্যভূমি

দখিগঞ্জ শ্মশানঘাট, যা একসময় শেষকৃত্যের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় তা পরিণত হয় হত্যাস্থলে। ৩ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাসের দুটি মেস থেকে ১০ জনকে এখানে নিয়ে এসে হত্যা করা হয়। মন্টু ডাক্তারসহ বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী এই নির্মম ঘটনার সাক্ষ্য দিয়েছেন।

দখিগঞ্জ শ্মশানঘাট বধ্যভূমি, রংপুর
দখিগঞ্জ শ্মশানঘাট বধ্যভূমি, রংপুর।

সাহেবগঞ্জ বধ্যভূমি

রংপুর জেলখানা থেকে ধরে আনা ১১ জন বন্দী ইপিআর সদস্যকে সাহেবগঞ্জ এলাকায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরে তাদের লাশ গোপনে পুঁতে ফেলা হয়, যা পরবর্তীতে গণকবর হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই স্থানটি মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি সেনাদের প্রতি হানাদার বাহিনীর প্রতিশোধপরায়ণতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

মডার্ন সিনেমা হল বধ্যভূমি

সাহেবগঞ্জের মডার্ন সিনেমা হলের পেছনের এলাকা ছিল এক ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্র। ১ মে রাতে ১৯ জন বাঙালি সেনা অফিসার ও সৈনিককে এখানে এনে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। একই স্থানে প্রায় ৩০০ জন বন্দীকে ১৩ দিন ধরে অমানবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছিল। এই বিভীষিকা থেকে কেবল একজন রিকশাচালক অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরতে সক্ষম হন।

দেবীপুর, কুকুরুন বিল ও শিবগঞ্জ বধ্যভূমি

দেবীপুর, কুকুরুন বিল এবং শিবগঞ্জ অঞ্চলেও পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। গ্রামেগঞ্জে তল্লাশির নামে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হতো। এসব এলাকায় অসংখ্য অচিহ্নিত গণকবর ছড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

টাউন হল বধ্যভূমি

রংপুর টাউন হল ছিল দখলদার বাহিনীর অন্যতম প্রধান নির্যাতনকেন্দ্র। এখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও ধরে এনে অমানবিক নির্যাতন করা হতো। নারীদের আলাদা করে আটকে রেখে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় এবং তাদের লাশ টাউন হলের পেছনের কৃষিক্ষেতে পুঁতে ফেলা হয়। এই স্থানটি রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও নির্মম বধ্যভূমিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

কুড়িগ্রাম জেলার বধ্যভূমি ও গণহত্যা

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

সার্কিট হাউস বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করার পর সার্কিট হাউস এলাকাকে দ্রুত সামরিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে রূপান্তর করে। এখানে অবস্থান নিয়ে তারা শহরের বিভিন্ন দিক থেকে ধরে আনা নিরীহ মানুষদের ওপর নির্যাতন চালাতে শুরু করে। সেদিন নির্বিচারে গুলিবর্ষণে অন্তত পাঁচজন কারারক্ষীসহ বহু সাধারণ নাগরিক নিহত হন।

১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী পুনরায় এলাকায় ফিরে এসে আরও বৃহৎ পরিসরে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধরপাকড় ও নির্যাতন শুরু করে। স্থানীয়দের মতে, সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় রাতভর গুলির শব্দ শোনা যেত এবং আটক মানুষদের আর জীবিত ফিরে আসতে দেখা যেত না। ফলে সার্কিট হাউস এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় কুড়িগ্রামের অন্যতম আতঙ্কঘন হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

ফুড অফিস বধ্যভূমি

কুড়িগ্রাম ফুড অফিস সংলগ্ন এলাকাও ছিল ৭ এপ্রিলের হত্যাযজ্ঞের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে মানুষদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হতো। হত্যার পর দ্রুত লাশ সরিয়ে ফেলা বা মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে এলাকাটিতে মানব কঙ্কাল ও হাড়গোড়ের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকদের কাছে স্থানটি সম্ভাব্য গণকবর হিসেবে বিবেচিত।

জজকোর্ট পুকুর বধ্যভূমি

কুড়িগ্রাম জজকোর্টের সামনে অবস্থিত পুকুরপাড় মুক্তিযুদ্ধের সময় এক নৃশংস হত্যাস্থলে পরিণত হয়। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ধরে এনে এখানে গুলি করে হত্যা করত। অনেক মরদেহ পুকুরপাড়ের মাটির নিচে গোপনে পুঁতে রাখা হয়।

স্বাধীনতার পর স্থানীয় প্রবীণদের সাক্ষ্য ও অনুসন্ধানে এই জায়গার বিভীষিকাময় ইতিহাস প্রকাশ পায়, যা আজও কুড়িগ্রামবাসীর স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

রিভারভিউ হাইস্কুল বধ্যভূমি

কুড়িগ্রাম রিভারভিউ হাইস্কুলসহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাকবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে পরিণত হয়েছিল। এসব স্থানে সাধারণ মানুষ, বিশেষত যুবক ও সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধাদের আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন চালানো হতো।

নির্যাতনের পর অনেককেই হত্যা করে রাতের আঁধারে লাশ সরিয়ে ফেলা হতো। ফলে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার স্থানগুলো একসময় ভয়াবহ নির্যাতনকেন্দ্রে রূপ নেয়।

ভূরুঙ্গামারী সিও অফিস বধ্যভূমি

ভূরুঙ্গামারীর সিও অফিস ভবন (বর্তমানে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়) ছিল নারীদের ওপর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের এক ভয়ংকর নিদর্শন। এই ভবনকে আটক ও নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বহু নারী ও তরুণীকে এখানে জোরপূর্বক আটক রেখে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

স্বাধীনতার পর ভবনের দোতলা থেকে শতাধিক নির্যাতিতা নারীকে উদ্ধার করা হয়। এ স্থানটি মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার এক হৃদয়বিদারক স্মারক।

দাগারকুটি বধ্যভূমি, উলিপুর

উলিপুরের দাগারকুটি এলাকায় ১৯৭১ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনী এক ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। স্থানীয় বর্ণনায় জানা যায়, পবিত্র রমজান মাসে সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞে প্রায় ৭৬৪ জন মানুষ প্রাণ হারান।

দাগারকুটি বধ্যভূমি, উলিপুর, কুড়িগ্রাম
দাগারকুটি বধ্যভূমি, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।

মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই শত শত মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। নিহতদের মরদেহ বড় বড় গণকবরে পুঁতে রাখা হয়। এই স্থানটি আজও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যাস্থল হিসেবে স্মরণ করা হয়।

মলেরহাট বধ্যভূমি, উলিপুর

মলেরহাট এলাকাতেও পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে হত্যা চালায়। স্থানীয়দের মতে, অন্তত ২১ জন নিরীহ মানুষকে এখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি এলাকাবাসীর মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের জন্ম দেয়।

ডাকবাংলো গণকবর, উলিপুর

উলিপুর ডাকবাংলো ছিল একটি কুখ্যাত নির্যাতনকেন্দ্র, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়কেই আটক রাখা হতো। বহু নারী এখানে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।

যুদ্ধশেষে এলাকাটিতে ৮–১০টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে এই স্থানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।

চর বেরুবাড়ি বধ্যভূমি, নাগেশ্বরী

নাগেশ্বরীর চর বেরুবাড়ি গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী রাজাকার ও ইপিক্যাফ সদস্যরা আক্রমণ চালায়। প্রায় ১৫০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর গ্রামবাসীদের একত্র করে গুলি করা হয়। অন্তত ১৮ জনকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে হত্যা করা হয়।

নাগেশ্বরী থানা স্কুল বধ্যভূমি

নাগেশ্বরী থানার স্কুল ভবনও অস্থায়ী আটককেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে আটক মানুষদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে পরে হত্যা করা হতো বলে স্থানীয়রা জানান।

কোদালকাঠি বধ্যভূমি, রৌমারী

রৌমারীর কোদালকাঠি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ধারণা করা হয়, ২০০–৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়।

নীলুর খামার বধ্যভূমি, নাগেশ্বরী

১৮ নভেম্বর নাগেশ্বরীর নীলুর খামার এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামজুড়ে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং পালাতে থাকা মানুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। অন্তত ৭৯ জন নিহত হন এবং পুরো গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

বেলগাছার গণহত্যা

১৪ এপ্রিল বেলগাছা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। চেয়ারম্যান ডা. ছফর উদ্দিন, আলহাজ সজর উদ্দিনসহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ নিহত হন।

চানমারী বধ্যভূমি

চানমারী এলাকাও ছিল গণহত্যার শিকার। এখানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

ব্যাপারী পাড়া বধ্যভূমি

কুড়িগ্রামের নতুন শহর এলাকার ব্যাপারী পাড়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ ধরে এনে হত্যা করত।

ঠাটমারী ব্রিজ বধ্যভূমি

ঠাটমারী ব্রিজ ও তিস্তা–কুড়িগ্রাম রেললাইন সংলগ্ন এলাকা ছিল নির্যাতন ও হত্যার আরেকটি কেন্দ্র। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষকে এখানে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। পুরো এলাকা এক ভয়ংকর বধ্যভূমিতে পরিণত হয়।

লালমনিরহাট জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভূমিসমূহ।

কালীগঞ্জ বধ্যভূমি, কালীগঞ্জ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কালীগঞ্জ উপজেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস দমন–পীড়নের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে ওঠে। এ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছিল নিত্যসঙ্গী। আশপাশের বিভিন্ন জনপদ থেকে শত শত নিরীহ বাঙালিকে ধরে এনে ভোটমারী এলাকার নির্জন স্থানে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতো। লালমনিরহাট জেলার বৃহত্তম বধ্যপুকুর হিসেবে পরিচিত স্থানটি অবস্থিত কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারীতে। ভোটমারী রেলস্টেশন থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে মেঠোপথ ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় সেই মৃত্যুকূপে। মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মাস্টারের বাড়ির সামনে, বাঁশঝাড় ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা ছোট্ট এক পরিত্যক্ত পুকুর—দেখলে বোঝার উপায় নেই, একসময় এটি ছিল নৃশংস গণহত্যার নীরব মঞ্চ। অথচ এই অবহেলিত পুকুরই বহন করে মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহীদের আত্মত্যাগের নিঃশব্দ ইতিহাস। যখন সারা দেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই পুকুরের পানিতে প্রতিদিন রক্ত মিশে যাচ্ছিল।

স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রায় প্রতিদিনই ১৫ থেকে ২০ জন নারী-পুরুষকে পশুর মতো জবাই করে এই পুকুরে ফেলে দেওয়া হতো। একের পর এক মরদেহ পানিতে ভেসে থাকত—দৃশ্যটি ছিল এতটাই ভয়াবহ যে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রাণভয়ে অনেক বাসিন্দা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে থাকলেও সুযোগ পেলেই গোপনে এসে পুকুরপাড়ের সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে যেতেন। পরে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে খবর পৌঁছে দেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই হত্যাযজ্ঞের মূল হোতা ছিল স্থানীয় রাজাকার ওসমান মৌলভী। প্রতিদিন ভোরে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সে বধ্যভূমিতে এসে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিত।

এই বর্বরতার অবসান ঘটাতে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সালামের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি দল বধ্যপুকুরের প্রায় চারশ মিটার পূর্বে মদাতি রব্বানীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে ওৎ পেতে থাকে। এক সকালে ওসমান মৌলভী ঘটনাস্থলে এলে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা চালায়। বুলুর স্টেনগানের গুলিতে ওসমান মৌলভীর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর ওই বধ্যপুকুরে আর গণহত্যা চালানো সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের মতে, কাকিনার আমজাদ হোসেন, জোবেদ আলী, মানিকসহ বহু মুক্তিযোদ্ধাকেও জবাই করে এই পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

কালীগঞ্জ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, লালমনিরহাট
কালীগঞ্জ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, লালমনিরহাট।

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লালমনিরহাট শত্রুমুক্ত হওয়ার পর মানুষ ধীরে ধীরে বাড়িতে ফিরে আসে। তখন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে এই বধ্যপুকুরটি দেখতে। তারা এসে দেখতে পায়, পুকুরপাড় ও আশপাশে অসংখ্য মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে—যা সেই নৃশংসতার নির্মম প্রমাণ বহন করছিল।

মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মাস্টার যুদ্ধ শেষে নিজ বাড়িতে ফিরে এসে এই করুণ দৃশ্য দেখেন। তিনি ছড়িয়ে থাকা মানুষের কঙ্কাল ও হাড় সংগ্রহ করে একটি গণকবর তৈরি করে সেগুলো যথাযথভাবে সমাহিত করেন। তিনিই প্রথম এই স্থানটির নাম দেন “বধ্যপুকুর”—যে নাম আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

দুঃখজনকভাবে, এত বড় ইতিহাস বহন করেও বধ্যপুকুরটি আজও যথাযথভাবে সংরক্ষিত বা চিহ্নিত হয়নি। পুকুরটি এখনও আগের মতোই অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়রা শ্রদ্ধা ও ভয়ের মিশ্র অনুভূতি থেকে এখনও সেখানে নামে না, এমনকি পুকুরের মাছও কেউ ধরে না। এর পাশাপাশি কালীগঞ্জ ইউপি ডিগ্রি কলেজের পাশেও একটি বৃহৎ গণকবরের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। যুদ্ধ-পরবর্তী অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সাক্ষ্যে সেখানে বহু শহীদের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। পুরো এলাকাজুড়ে আজও ছায়া ফেলে আছে ১৯৭১ সালের সেই বর্বরতার স্মৃতি—নীরব কিন্তু গভীর, ইতিহাসের কাছে এক অমোচনীয় দলিল হয়ে।

বিডিআর লাইন বধ্যভূমি, কাশীগঞ্জ

লালমনিরহাট শহরের কাশীগঞ্জ এলাকায় বিডিআর লাইনের নিকটবর্তী স্থানে একটি বড় বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা এখানে আটক নিরীহ বাঙালিদের এনে নির্মমভাবে হত্যা করত। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একদিনেই অন্তত ৩২ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করে তাদের লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল।

ঘটনার পর দীর্ঘদিন এলাকাটি আতঙ্কের স্মৃতি বহন করে। স্বাধীনতার পর স্থানীয়দের সাক্ষ্য ও অনুসন্ধানে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রেলস্টেশন রিকশাস্ট্যান্ড বধ্যভূমি

লালমনিরহাট রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশে ওভারব্রিজের নিচে অবস্থিত শানবাঁধানো রিকশাস্ট্যান্ড মুক্তিযুদ্ধের সময় শহরের প্রধান বধ্যভূমিগুলোর একটিতে পরিণত হয়। জনবহুল এলাকা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা এখানে প্রকাশ্যেই মানুষ হত্যা করত, যাতে ভয়ের পরিবেশ ছড়িয়ে পড়ে।

রেলস্টেশন (রিকশাস্ট্যান্ড) বধ্যভূমি, লালমনিরহাট
রেলস্টেশন (রিকশাস্ট্যান্ড) বধ্যভূমি, লালমনিরহাট।

নিহতদের অনেকের লাশ দ্রুত সরিয়ে ডিভিশনাল অফিসের দক্ষিণে অবস্থিত জলাভূমিতে ফেলে দেওয়া হতো। ফলে রিকশাস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে রক্তাক্ত ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায়।

ডিভিশনাল অফিস জলাভূমি বধ্যভূমি

লালমনিরহাট শহরের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর বহু মরদেহ এনে ডিভিশনাল অফিসের দক্ষিণে অবস্থিত বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে ফেলে দেওয়া হতো। পানিতে ডুবে থাকা বা কাদায় চাপা পড়ে থাকা এসব দেহাবশেষ দীর্ঘদিন অচিহ্নিত অবস্থায় ছিল।

স্বাধীনতার পর স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, এই জলাভূমির নিচে অসংখ্য শহীদের দেহাবশেষ চাপা পড়ে আছে। এটি শহরের অন্যতম নীরব গণকবর হিসেবে বিবেচিত।

বড়বাড়ির হাট গণকবর

বড়বাড়ির হাট এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাধিক গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা অন্তত ১০০ জন নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে বিচ্ছিন্নভাবে এসব স্থানে মাটিচাপা দেয় বলে স্থানীয়রা জানান।

যুদ্ধের পর বিভিন্ন সময়ে মাটি খুঁড়ে হাড়গোড় ও কঙ্কালের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে প্রচলিত রয়েছে, যা এই স্থানটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণকবর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে।

সাহেবপাড়া গণকবর

সাহেবপাড়া এলাকাতেও একাধিক গণকবর ছড়িয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে বিচ্ছিন্নভাবে বহু মানুষকে হত্যা করে গোপনে দাফন করা হয়। স্থানীয় স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, অন্তত ৫০ জন শহীদ এই এলাকাতেই সমাহিত রয়েছেন।

সাহেবপাড়া গণকবর, লালমনিরহাট
সাহেবপাড়া গণকবর, লালমনিরহাট।

যদিও সব কবর চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি, তবুও সাহেবপাড়া লালমনিরহাটের গণহত্যার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত।

হাতীবান্ধা গণকবর

হাতীবান্ধা উপজেলাও পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি। বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদ থেকে ধরে আনা মানুষদের এখানে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। ধারণা করা হয়, প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।

স্থানীয়দের মুখে মুখে এসব ঘটনার স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে, যা প্রমাণ করে হাতীবান্ধা অঞ্চলটিও মুক্তিযুদ্ধের সময় এক বেদনাবিধুর হত্যাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।

গাইবান্ধা জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভূমিসমূহ।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গাইবান্ধা জেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সংগঠিত বর্বরতার এক নির্মম ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলটি উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগপথ, রেললাইন ও নদীপথের কারণে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কৌশলগত ছিল। ফলে পাকবাহিনী এখানে শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে আশপাশের জনপদে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা, সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ছড়িয়ে প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক ভিত্তি ধ্বংস করা।

এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তারা শহর, বন্দর, রেলস্টেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার এলাকা এবং প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে অভিযান চালায়। সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক—কেউই তাদের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায়নি। মানুষকে বাড়ি থেকে ধরে এনে সামরিক ক্যাম্পে আটকে রাখা হতো, চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন, তারপর অনেককে গুলি করে হত্যা করা হতো কিংবা গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হতো। বহু নারী ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হন, যা ছিল যুদ্ধের একটি পরিকল্পিত অস্ত্র। অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের কবরের স্থান আজও অজানা।

গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সেই সময়ের নির্মম বাস্তবতার নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও পুকুরপাড়, কোথাও রেললাইনের ধারে, কোথাও বিদ্যালয়ের মাঠ কিংবা পরিত্যক্ত মাঠ—এসব স্থান একসময় পরিণত হয়েছিল মৃত্যুকূপে। স্বাধীনতার পর স্থানীয়দের স্মৃতিচারণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং উদ্ধার হওয়া মানবকঙ্কাল এসব জায়গার ইতিহাসকে স্পষ্ট করে তোলে। আজও এসব স্থান শুধু শোকের নয়, ইতিহাসের দলিল—যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয় মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত সেই ভয়াবহ গণহত্যা, এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য বাঙালির ত্যাগের গভীরতা।

হেলাল পার্ক বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধের সময় গাইবান্ধা শহরের হেলাল পার্ক এলাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি কুখ্যাত হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। শহরের ভেতরে তুলনামূলক নির্জন ও নিয়ন্ত্রিত এই স্থানটিকে পাকবাহিনী আটক ও হত্যার জন্য ব্যবহার করত। বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা নিরীহ বাঙালি—যাদের মধ্যে ছাত্র, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ এবং সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধা সমর্থকরা ছিলেন—তাদের এখানে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, এই হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। তাঁদের মধ্যে মেজর মাহমুদ, মেজর আফজাল, লে. নেওয়াজ রিজভী, মেজর তহসীন মির্জা এবং মেজর শের খানের নাম স্থানীয়ভাবে উল্লেখিত হয়ে আসছে। তাঁদের নেতৃত্বে বন্দীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর পর অনেককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হতো। হত্যার পর লাশ দ্রুত সরিয়ে ফেলা বা গোপনে মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো, যাতে ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ প্রমাণ মুছে ফেলা যায়।

এই বিভীষিকাময় ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য আসে ছাত্র শাহীনের কাছ থেকে, যিনি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি পালাতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে তাঁর বর্ণনায় হেলাল পার্কের হত্যাযজ্ঞের বহু অজানা তথ্য প্রকাশ পায়। তাঁর সাক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আজ হেলাল পার্ক এলাকা শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়—এটি গাইবান্ধার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর স্মারক, যা নিরীহ মানুষের আত্মত্যাগ ও পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার নীরব সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

কফিল শাহ গুদাম বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধের সময় গাইবান্ধা শহরের কফিল শাহ গুদামের সংলগ্ন বিস্তীর্ণ খোলা মাঠটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়। শহর ও আশপাশের গ্রামাঞ্চল থেকে ধরে আনা নিরীহ মানুষদের এখানে এনে আটক রাখা, নির্যাতন এবং পরবর্তীতে হত্যা করা হতো। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন বন্দীদের এখানে আনা হতো, যাদের অনেকেই আর কখনও জীবিত ফিরে যাননি।

স্বাধীনতার পর এলাকাবাসীর সহায়তায় অনুসন্ধান চালিয়ে এই স্থানে গণকবরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। মাটির নিচ থেকে মানুষের হাড়গোড়, ব্যবহৃত কাপড়চোপড়, রক্তমাখা রুমাল, ছেঁড়া শাড়ির অংশ এবং নারীদের চুল পর্যন্ত উদ্ধার হয়—যা এই স্থানে সংঘটিত নারকীয় নির্যাতনের নির্মম সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষ করে নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো স্থানীয় স্মৃতিতে গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। কফিল শাহ গুদাম এলাকা তাই শুধু একটি বধ্যভূমি নয়, বরং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মর্মান্তিক স্মারক।

কাশিয়াবাড়ি বধ্যভূমি, পলাশবাড়ী

পলাশবাড়ী উপজেলার কাশিয়াবাড়ি গ্রাম ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের ভয়াবহ বর্বরতার শিকার হয়। গ্রামটিতে অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং নির্বিচারে মানুষ ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, পুরো গ্রামটি কয়েক দফায় হামলার শিকার হয় এবং প্রায় ৭০০ পরিবারের মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সহিংসতার কবলে পড়ে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে কাশিয়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অসংখ্য গ্রামবাসীকে সেখানে জড়ো করে বেয়নেট ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। অনেককে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়, আবার কারও কারও মরদেহ গণকবরে ফেলে রাখা হয়। নারীদের ওপর চালানো হয় ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন, যা গ্রামটির সামাজিক ও মানসিক কাঠামোয় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। আজ কাশিয়াবাড়ি শুধু একটি গ্রাম নয়—এটি মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক করুণ স্মারক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

কাশিয়াবাড়ি বধ্যভূমি, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা
কাশিয়াবাড়ি বধ্যভূমি, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা।

ভরতখালী বধ্যভূমি

গাইবান্ধা জেলার ভরতখালী এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এক নৃশংস হত্যাস্থলে পরিণত হয়। রেললাইনের পাশের নির্জন অঞ্চলকে বেছে নিয়ে সেখানে বহু নিরীহ মানুষকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করা হতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হত্যার পর দ্রুত লাশগুলো মাটিচাপা দেওয়া হতো যাতে ঘটনার কোনো চিহ্ন প্রকাশ না পায়। স্বাধীনতার পর স্থানীয়দের উদ্যোগে অনুসন্ধান চালালে এখানে গণকবরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।

নিহতদের মধ্যে একরাম উদ্দিন, বিজয় চন্দ্র মৈত্রসহ আরও অনেকের নাম স্থানীয় স্মৃতিতে সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন প্রিয়জনদের সন্ধান পাননি; পরে গণকবরের সন্ধান মেলার পর এই স্থানটি শহীদদের স্মৃতির সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। ভরতখালী বধ্যভূমি আজও সেই বর্বরতার নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পুরাতন ফুলছড়ি বধ্যভূমি

ফুলছড়ি এলাকার পুরাতন জনপদ মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধরে আনা অসংখ্য মানুষকে এখানে আটকে রেখে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। ধারণা করা হয়, হাজারেরও বেশি মানুষ এই স্থানে প্রাণ হারান।

স্বাধীনতার পর এলাকাবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে গণকবর শনাক্ত করা হয় এবং শহীদদের স্মরণে সেখানে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এই স্মৃতিস্তম্ভ আজও পথচারীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় সেই অন্ধকার সময়ের নির্মম ইতিহাস।

নয়াঘাট বধ্যভূমি

সাঘাটা থানার অন্তর্গত নয়াঘাট এলাকা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গোপন হত্যাকাণ্ডের একটি স্থানে পরিণত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের সন্দেহভাজন সাধারণ মানুষদের ধরে এনে এখানে হত্যা করে গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হতো বলে স্থানীয়রা জানান।

যুদ্ধশেষে স্থানীয় অনুসন্ধান ও প্রবীণদের সাক্ষ্যে এই স্থানের ইতিহাস ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। নয়াঘাট আজ স্থানীয়ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত, যেখানে বহু অচিহ্নিত শহীদের স্মৃতি মাটির নিচে লুকিয়ে আছে।

বোনারপাড়া রেল জংশন বধ্যভূমি

বোনারপাড়া রেল জংশন ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে ছিল। স্থানীয়দের মতে, এখানে বন্দীদের ওপর অকথ্য নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো—কয়লাচালিত রেলইঞ্জিনের আগুন ব্যবহার করে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা।

হত্যার পর লাশগুলো রেললাইনের ধারে গোপনে পুঁতে রাখা হতো। স্বাধীনতার পর অনুসন্ধানে মানবদেহের অবশেষ পাওয়া গেলে এই স্থানের বিভীষিকাময় ইতিহাস উন্মোচিত হয়। বোনারপাড়া জংশন তাই মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার এক শিউরে ওঠা স্মারক।

ত্রিমোহনী ঘাট বধ্যভূমি

ত্রিমোহনী ঘাট এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের একাধিক ঘটনা ঘটে। ২৪ অক্টোবরের এক সম্মুখসমরে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং ফরেক আলী শহীদ হন। তাঁদের মরদেহ যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকলে স্থানীয় সাহসী গ্রামবাসীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেগুলো উদ্ধার করেন।

পরে শহীদদের মরদেহ রামনগর ও মুক্তিনগর গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়। ত্রিমোহনী ঘাট তাই শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং আত্মত্যাগ ও স্থানীয় জনগণের সাহসিকতার এক অনন্য স্মারক।

কামারজানি বাঁধ বধ্যভূমি

কামারজানি গ্রামের বাঁধ সংলগ্ন এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি গণকবরস্থানে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয়দের মতে, অন্তত সাতজন শহীদকে এখানে হত্যা করে একসঙ্গে মাটিচাপা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানটি নীরবে শহীদদের স্মৃতি বহন করে এসেছে।

কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনের ফলে বর্তমানে এই বধ্যভূমির দৃশ্যমান চিহ্ন বিলীন হয়ে গেছে। তবুও স্থানীয় স্মৃতিতে জায়গাটি আজও পবিত্র ও বেদনাময় স্মারক হিসেবে বেঁচে আছে।

সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি

সুন্দরগঞ্জ থানার শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এখানে অন্তত ১৮ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ শতাধিক মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয়। অনেককেই নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হয় এবং একই স্থানে গণকবর দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর এলাকাটি গণকবর হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং শহীদদের স্মরণে স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হয়। সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি আজও স্থানীয় জনগণের কাছে শোক, শ্রদ্ধা ও ইতিহাসের এক গম্ভীর স্মারক হয়ে আছে।

সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি, গাইবান্ধা
সুন্দরগঞ্জ বধ্যভূমি, গাইবান্ধা।

সিঅ্যান্ডবি অফিস বধ্যভূমি

পলাশবাড়ীর সিঅ্যান্ডবি অফিস সংলগ্ন এলাকা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার সাক্ষী স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৬০০ নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং মৃতদেহগুলো গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

এছাড়া, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এই এলাকায় সেনাবাহিনী ও ইপিআর সদস্যদের মধ্যে এক প্রলয়সংকুল সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষে ২১ জন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এই ঘটনাগুলো পরে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর ক্ষত ও শোকের ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। সিঅ্যান্ডবি অফিস বধ্যভূমি তাই শুধু গণহত্যার এক স্মারক নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহস ও আত্মত্যাগের ইতিহাসেরও সাক্ষী।

কাটাখালি ব্রিজ পার্ক বধ্যভূমি

বালিয়াবাড়ি থানার কাটাখালি ব্রিজ পার্ক এলাকা পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার এক ভয়াবহ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এখানে বিশেষভাবে নারীদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হতো এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হতো। স্থানীয়দের ধারনা অনুযায়ী, মাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানে ৫০০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান।

পার্কের দক্ষিণ পাশে একটি বড় গণকবর রয়েছে, যেখানে নিহতদের অস্থি মাটির নিচে লুকানো আছে। এই বধ্যভূমি আজও নীরবতার সঙ্গে সেই ভয়াবহ ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, এবং স্থানীয়দের স্মৃতিতে শোক, দুঃখ ও স্মরণীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আব্দুল হামিদ স্টেডিয়ামসংলগ্ন বধ্যভূমি, গাইবান্ধা
অরক্ষিত পড়ে আছে জেলা শহরের আব্দুল হামিদ স্টেডিয়ামসংলগ্ন বধ্যভূমি, গাইবান্ধা।

জয়পুরহাট জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জয়পুরহাট জেলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। জেলা ও এর আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু, নারী এবং বয়স্কসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। সেই সময় বগুড়া জেলার মহকুমা জয়পুরহাট হয়ে বহু মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করলেও, পাকিস্তানি সেনারা ৯ মাসব্যাপী হত্যা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বহু শরণার্থীকে হত্যা করে গণকবরে দাফন করেছিল।

জয়পুরহাট জেলায় মোট ৫২টি বধ্যভূমির স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে চারটি স্থান বিশেষভাবে চিহ্নিত ও সংরক্ষিত। এই চিহ্নিত বধ্যভূমিতে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারি অর্থায়নে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এসব স্মৃতিসৌধ এবং বধ্যভূমি দেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও শোষণের বিরুদ্ধে গণমানুষের সাহসিকতার নিদর্শন হিসেবে সমুন্নত থাকে।

সদর উপজেলার কুঠিবাড়ি ব্রিজ, চিনিকল পুকুরের পূর্বপাড়, ক্ষেতলাল উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ, পাঁববিবি উপজেলার ছোট যমুনা নদীর পাড়সহ জয়পুরহাট জেলায় ৫২টি স্থানে তৎকালীন সময়কার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা হাজার হাজার নিরীহ মানুষের লাশ গণকবরের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করেছে। এই সব স্থান আজও শহীদদের আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এবং স্থানীয় মানুষদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কড়ই-কাদিপুর বধ্যভূমি

জয়পুরহাট শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে সদর থানার বম্বু ইউনিয়নের কড়ই ও কাদিপুর নামের দুটি ছোট গ্রাম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার ও আলবদরের নৃশংসতার এক ভয়াবহ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

২৬ এপ্রিল সোমবার সকাল ১০টার দিকে, হানাদাররা এই দুটি গ্রামে অবস্থানরত প্রায় ৩৭১ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মৃৎশিল্পীকে গ্রামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের উপর নির্বিচার গুলি চালায়। শীর্ষহীন হত্যার পাশাপাশি তারা গ্রামে আগুন লাগিয়ে ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে দেয়। গ্রামটি সেই ভয়াবহ দিনটি জীবনের জন্য এক বিভীষিকাময় স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়।

কড়ই-কাদিপুর বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জয়পুরহাট
কড়ই-কাদিপুর বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জয়পুরহাট।

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, শহীদদের পরিবারের মধ্যে অনেকেই বেঁচে থাকলেও, এই হত্যাযজ্ঞের কাহিনী প্রজন্মের পর প্রজন্মে চলে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে শহীদের স্মরণে এই স্থানে নির্মাণ করা হয় একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ, যা আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এবং মৃত্যুর মিছিলের মাধ্যমে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করায়।

পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি

"জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বে পাগলা দেওয়ান গ্রাম। তার আশেপাশে চক বরকত, খাস পাহনন্দা, চিরলাসহ কয়েকটি ভারত সীমান্তবর্তী গ্রাম। এই গ্রামগুলোয় ’৭১ এর এপ্রিল থেকে নজর রাখতে শুরু করে হানাদাররা। যুদ্ধের সময় তখন টগবগে তরুণ চিরলা গ্রামের আবু সালেম মিয়া জানান, “ভাবলাম কয়েকজন হানাদারকে হত্যা বা বোমা মেরে তাঁদের গাড়ি উড়িয়ে দিলে ভয়ে এই এলাকায় আসবে না তার। তাই পাক হানাদার বাহিনীর চলাচলের পথে ডিনামাইট বসাই। সেদিন, সোমবার বিকেল, পাক বাহিনীর গাড়ি যাওয়ার সময় ডিনামাইটটি বিস্ফোরণ হয়ে উড়ে যায়। ৪/৫ জন পাক সেনা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আরও ১৪ জন আহত হয়।

মোজাম্মেল হক, গণকবর থেকে বেঁচে যাওয়া আবেদ আলীসহ এলাকাবাসী জানান, ওই ঘটনার পর ১৮ জুন শুক্রবার ওই গ্রামগুলো থেকে জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরা মুসল্লি ও মাঠে কর্মকর্তাদের দেড়।দুই শ’ মানুষকে রাজাকার ও সেনারা ধরে এনে। শান্তি কমিটির আদেশ পালনকারী ও অন্যদের দু’টি সারিতে দাঁড়াতে আদেশ না বুঝেই গ্রামবাসীরা যে যার মত দুই সারিবদ্ধ হন। শান্তি কমিটির লোক হিসেবে এক সারির ছেড়ে দিয়ে অন্য সারির ৪০/৪৫ জন লোককে দুর্বিসহ নির্যাতন করে। প্রথমে তাঁদের স্তুপকৃত বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত তৃণ (স্থানীয় ভাষায় ‘কাঁটা খুড়া’) উপর দিয়ে হাঁটায়। যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে তার পায়ে দড়ি বেঁধে পাশের একটি পরিত্যাক্ত বাড়িতে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।

গণকবর থেকে বেঁচে যাওয়া চিরলা গ্রামের সলিম মিয়া জানান, তাকেসহ ৫/৭ জনকে গর্ত খুঁড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়। লম্বায় ৪/৫, প্রস্থে ১০/১২ এবং গভীরে ৪/৫ হাত গর্ত খোঁড়া হলে কাঁটা বিষে অজ্ঞান হয়ে পড়াদের জবাই করে ওই গর্তে ফেলে দেওয়া হয়। সলিম বলেন, “তাকেসহ গর্ত খোঁড়ার কাজে নিয়োজিতদের শেষের দিকে একই কায়দায় জবাই করে ওই গর্তে ফেলে দেওয়া হয়”। “এ সময় বৃষ্টি আসলে পাক সেনারা ক্যাম্পে চলে যায়। সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে আসে। বৃষ্টির পানিতে জ্ঞান ফিরে এলে আহত অবস্থায় ৮ জন ওই গণকবর থেকে বেঁচে যান”।

অন্য এক বেসরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, জয়পুরহাটের পাগলা দেওানে পাকবাহিনী ও তার দোসররা চার হাজার মানুষকে হয়তা, এক হাজার নারীর সম্ভ্রম হরণ এবং অসংখ্য বাড়িঘর ধ্বংস করে। পাগলা দেওয়ান ও তার আশেপাশের  চর বরকত, নামুজানিধি, পুনন্দা, নওপাড়া, চিরলা, রূপনারায়নপুর, জগদীশপুর, ভুটিয়াপাড়া, মল্লিকপুরসহ অসংখ্য গ্রামে পাক নৃশংসতার চিহ্ন বর্তমান। মাজারের পঁচিশ হাত দূরে একটি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া যায়। এখানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখা হয়। মাজারের পশ্চিম দিকের বাঁধানো কূপটি মৃতদেহে ঠাসা ছিল। ভারতে যাওয়ার সময় শত শত বাঙালি পাকসেনাদের হাতে প্রাণ হারায়। আবার একসাথে ৭০/৮০ টি গরু ও মহিষের গাড়ি যাত্রী বোঝাই করে ভারতে যাওয়ার সময় পাকসেনাদের ধরে এনে সবাইকে গুলি করে হত্যা করে। প্রতিদিনই ওরা গ্রাম থেকে মেয়েদের ধরে আনতো  এবং মাজারের চারপাশে নির্মিত বাঙ্কারে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করতো। স্বাধীনতার পর এর আশপাশ থেকে শাড়ি, ব্লাউজ ও অন্যান্য জিনিস পাওয়া গেছে। (মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংগৃহীত তথ্যসূত্র: যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ ডা. এম. এ. হাসান, পৃ.-৪২৪; মুক্তিযুদ্ধ কোষ, দ্বিতীয় খণ্ড মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, পৃ.-৩৫২-৩৫৩; একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর সুকুমার বিশ্বাস, পৃ.-১০২; দৈনিক সংবাদ, ১৬ এপ্রিল ১৯৯৪)

পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি, জয়পুরহাট
পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি, জয়পুরহাট।

গণকবর থেকে বেঁচে যাওয়া চিরলা গ্রামের সলিম মিয়া বলেন, “এই পাগলা দেওয়ানেই গণকবরের পাশে প্রায় ১০০ গজের মধ্যে আরো একটি গণকবর রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার হিন্দু ধর্মালম্বী নরনারী পাগলা দেওয়ান করিডোর হয়ে ভারতে যাবার সময় ব্রাশ ফায়ার করে তাঁদের হত্যা করে পাক হানাদাররা। খাস পাহনন্দা গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী এমদাদুল হক ও জয়পুরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সদস্য আফসার আলী জানান, সে সময় শরনার্থী হয়ে গরু গাড়িতে চড়ে ভারতে যাবার সময় প্রায় ২/৩শ’ হিন্দু নারীকে হানাদাররা ধরে গ্রামের পরিত্যাক্ত বাড়িতে রেখে পালাক্রমে রাতভর ধর্ষণ করত এবং সকাল হলে তাঁদের গুলি করে মেরে ফেলত। শিয়াল কুকুরে লাশ টানাটানি করত। ঐসব অর্ধগলিত লাশ, কঙ্কাল কুড়িয়ে জড়ো করে এই গণকবরে রাখা হয়েছে। পাগলা দেওয়ানের দুটি গণকবর সংরক্ষিত আছে।

আমুট্ট বধ্যভূমি

আক্কেলপুর উপজেলার রেলগেইট সংলগ্ন আমুট্ট খেলার মাঠে অবস্থিত আমুট্ট বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই স্থানটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদরের নির্মম হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেদিন কমপক্ষে ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং অসংখ্য নিরীহ মুক্তিকামী মানুষকে নির্বিচারভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং অনেকের গলা কেটে নির্যাতন চালানো হয়। এছাড়া রাজাকাররা এখানে ট্রেন থামিয়ে লুটপাট চালাতো এবং যুবকদের ধরে এনে হত্যা করত, যা পুরো এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।

এ গণকবরের শহীদ তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আটজনের নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে অনেকে এখনও অজ্ঞাত পরিচয়ে সমাহিত আছেন। স্মরণীয় আটজন হলেন—সাবের জোয়ারদার (গোপিনাথপুর), মোকলেছার রহমান, নবির উদ্দিন (বানদিঘর), নজের আলী প্রামানিক, নছির প্রামানিক, আছের প্রামানিক, ডা. বুমচান, এবং তোফাজ্জল হোসেন (তোফা)।

দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার এবং আক্কেলপুরের মুক্তিযোদ্ধা মনতাজুর রহমান আকবর জানান, “নিহত শহীদদের অনেককে একত্রে গণকবরের মধ্যে দাফন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ বছর এই স্থানটি নিঃসঙ্গভাবে অবহেলিত ছিল। পরে ১৯৯৬ সালে আক্কেলপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মুক্তিযোদ্ধা নূর হোসেন তালুকদার উদ্যোগ নিয়ে এই গণকবরের ওপর একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন, যা শহীদদের আত্মত্যাগের অমোঘ স্মারক হিসেবে আজও স্থানীয় ও ভ্রমণকারীদের কাছে স্মৃতিসম্পন্ন হয়ে আছে।”

নন্দুইল বধ্যভূমি

গোটা জেলার পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জি ইউনিয়নের নন্দুইল গ্রামেই অবস্থিত নন্দুইল বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এই গ্রাম ও এর আশপাশের আদিবাসী সম্প্রদায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়। এপ্রিল মাস থেকে পাক সেনারা গ্রামটিতে তাণ্ডব চালাতে শুরু করলে স্থানীয় আদিবাসীরা তীর ও ধনুক হাতে আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

স্থানীয় আদিবাসী যুবকদের সাহসিকতার কারণে অনেক শত্রু সৈন্য আহত হয়। তারা স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই চালানোর সময় পাকিস্তানি সেনারা বীরদের লক্ষ্যবস্তুতে গুলি চালায় এবং বেশ কয়েকজন শহীদ হন। এছাড়া গ্রামবাসীদের মধ্যে যারা আটক করা হয়েছিল, তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে একটি গর্তে পুঁতে রাখা হয়।

যেহেতু কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর যথাযথ তথ্য পাওয়া যায়নি, সঠিক শহীদসংখ্যা বা গণকবরের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায়নি। তবে স্থানীয় সূত্র—যেমন ধরঞ্জি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোস্তফা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমিনুল হক বাবুল—কমপক্ষে আটজন আদিবাসী শহীদ হয়েছেন বলে ধারণা করেন।

নন্দুইল বধ্যভূমি আজও ইতিহাসের সেই বিভীষিকাময় সময়ের নীরব সাক্ষী। এটি স্থানীয়দের কাছে শহীদদের আত্মত্যাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক, যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বগুড়া জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

রামশহর গণকবর

রামশহর এলাকায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে সংঘটিত এক নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মারক হিসেবে ১১ জন শহীদের গণকবর চিহ্নিত রয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ৬ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকার মতিউর রহমান, জাবেদ আলী ও ওসমান মাওলানার সহায়তায় তিনজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে যায়। তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন বলে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন। পরদিন ভোরে এলাকাবাসী ঝুঁকি নিয়ে মরদেহগুলো সংগ্রহ করে একত্রে দাফন করেন। এই গণকবর মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তেও পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার সাক্ষ্য বহন করে।

বাবুর পুকুর বধ্যভূমি

‘৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-বিজড়িত এক বিদগ্ধ জনপদের নাম বগুড়ার বাবুর পুকুর। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে, শাজাহানপুর উপজেলার খরনা ইউনিয়নে অবস্থিত এই স্থানটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শোকাবহ ও গৌরবময় স্মারক। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এখানে সংঘটিত করে এক ন্যাক্কারজনক গণহত্যা, যা বগুড়া জেলার ইতিহাসে গভীর বেদনার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

ঘটনার পূর্বে বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া, শাহপাড়া, তেঁতুলতলা, হাজিপাড়া ও পশারীপাড়া এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ‘রেড এলার্ট’ জারি করে। তাদের এদেশীয় দোসর, তথাকথিত শান্তি কমিটির সদস্যরা পূর্বপ্রস্তুত তালিকা অনুযায়ী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে সহায়তা করে। পরিকল্পিত অভিযানে মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যায়ক্রমে আটক করে সেনা কনভয়ে তুলে আনা হয় বাবুর পুকুরের নির্জন খেজুরগাছ-ঘেরা এলাকায়।

বিমূর্ত পাজর, বাবুর পুকুর বধ্যভূমি, বগুড়া
বিমূর্ত পাজর, বাবুর পুকুর বধ্যভূমি, বগুড়া।

ফজরের আযানের পূর্বমুহূর্তে বন্দিদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও হানাদার বাহিনী থেমে থাকেনি; বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিশ্চিত করা হয় মৃত্যু। এই নির্মমতা ছিল দখলদার বাহিনীর সন্ত্রাস সৃষ্টির কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া এবং জনগণের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া।

এই পাশবিক হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন বগুড়ার সাহসী সন্তানরা—মাহফুজুর রহমান, আঃ মান্নান পশারী, আঃ হান্নান পশারী, ওয়াজেদ রহমান টুকু, জালাল মন্ডল, মন্টু মন্ডল, আব্দুল সবুর, সাইফুল ইসলাম, আলতাফ আলী, ফজলুল হক খান, বাদশা মিয়া, আবুল হোসেন, টেলিফোন অপারেটর নুরজাহান লক্ষ্মী এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও একজন দেশপ্রেমিক। তাঁদের আত্মত্যাগ বগুড়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

ভার্জিনিয়া টোব্যাকো মিল গণকবর

বগুড়ার ভার্জিনিয়া টোব্যাকো মিল ছিল একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প ও নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত হয়। মিল চত্বরে শ্রমিক, পথচারী ও সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ, সোপ ফ্যাক্টরির পূর্ব-দক্ষিণ কোণ, পাওয়ার সেকশনসংলগ্ন গুদামের সামনে ও বয়লারসংলগ্ন স্থানে গণকবরের চিহ্ন পাওয়া যায়। স্থানীয় গবেষকদের মতে, এখানে ১০০-এর অধিক মানুষ নিহত হন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে হত্যাকেন্দ্রে রূপান্তরের এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকালীন দখলদার বাহিনীর কৌশলগত বর্বরতার দৃষ্টান্ত।

সার্কিট হাউস বধ্যভূমি

বগুড়া সার্কিট হাউস ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে অসংখ্য নর-নারীকে ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন চালানো হতো। অনেকে নির্যাতনের ফলে মৃত্যুবরণ করেন, আবার অনেককে গুলি করে হত্যা করে গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হয়। সার্কিট হাউস ছিল প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান; তাই এটিকে দখল করে পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় জনগণকে আতঙ্কিত ও নেতৃত্বশূন্য করার কৌশল নেয়।

তালোড়া বধ্যভূমি

বগুড়া জেলার তালোড়া বন্দর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থান ছিল। এখানকার কলাবাগান পুকুর, দুর্গাদহের পদ্মপুকুর, কৎপিতলাপুর পুকুরসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ধরে এনে নদীর ধারে বা পুকুরপাড়ে দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে গুলি করা হতো—যা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি সাধারণ হত্যাকৌশল। পদ্মপুকুরে এক রাতে পিতা-পুত্রসহ ১৪ জনকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়। তালোড়া বধ্যভূমি প্রমাণ করে যে, বন্দর ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোকে দখলে রেখে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস ও গণহত্যা চালিয়েছে।

তালোড়া (পদ্মপুকুর) বধ্যভূমিতে স্থানীয়দের নির্মাণ করা স্মৃতিস্তম্ভ, বগুড়া
তালোড়া (পদ্মপুকুর) বধ্যভূমিতে স্থানীয়দের নির্মাণ করা স্মৃতিস্তম্ভ, বগুড়া।

পুলিশ লাইন বধ্যভূমি

বগুড়া পুলিশ লাইন্স ছিল আরেকটি নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্র। বিভিন্ন গবেষণা ও স্মৃতিচারণে উল্লেখ আছে যে, বগুড়া জেলায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা করে বিভিন্ন স্থানে গোপনে পুঁতে রাখে। প্রায় ২৫ হাজার মানুষের হত্যার উল্লেখ স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া যায়, যদিও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ধারণ এখনো গবেষণাধীন। পুলিশ লাইন্সে আটক ব্যক্তিদের অনেককে আর জীবিত ফিরে আসতে দেখা যায়নি।

ওয়াপদা বধ্যভূমি

ওয়াপদা (তৎকালীন পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) এলাকার নির্জন স্থানে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। পরে তাদের মাটিচাপা দেওয়া হয়। এলাকাটি ছিল তুলনামূলক নিরিবিলি, যা হত্যাকাণ্ড গোপন রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো। স্থানীয়দের উদ্যোগে পরবর্তীকালে স্থানটি বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সান্তাহার বধ্যভূমি

সান্তাহার রেল জংশন ছিল উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। ২২ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনী সান্তাহার শহর ও আশপাশের গ্রামগুলোতে অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং শত শত নিরীহ মানুষ নিহত হন। সান্তাহার হত্যাকাণ্ড উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নৃশংস ঘটনার মধ্যে গণ্য।

সুখান পুকুর বধ্যভূমি

সুখান পুকুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ১১০ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে। কামুইল, ঘোনা, গোকুল, মাদলা প্রভৃতি গ্রাম থেকেও মানুষ ধরে এনে হত্যা করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞ ছিল গ্রামভিত্তিক গণহত্যার একটি উদাহরণ, যার লক্ষ্য ছিল সাধারণ জনগণের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া।

গাবতলী বধ্যভূমি

গাবতলী উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে গোপনে দাফন করত। এখনো অনেক স্থানের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান হয়নি বলে ধারণা করা হয়।

সোনাতলা বধ্যভূমি

সোনাতলা উপজেলায়ও একাধিক বধ্যভূমি ও গণকবর বিদ্যমান। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এখানে অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। এসব স্থানের সংরক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।

শিবগঞ্জ বধ্যভূমি

শিবগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে বহু মানুষ নিখোঁজ হন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, অনুসন্ধান চালালে অগণিত কঙ্কাল ও গণকবরের সন্ধান মিলতে পারে। দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকার কারণে অনেক স্থান অচিহ্নিত রয়ে গেছে।

ঘোনা বধ্যভূমি

ঘোনা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। গ্রামটির বিভিন্ন স্থানে গণকবর রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। সুখান পুকুর হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে ঘোনার ঘটনারও সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

চেলোপাড়া শান্তি নার্সারি বধ্যভূমি

চেলোপাড়া, নড়িওলি, ইছাইদহ, আকাশতারা প্রভৃতি গ্রামের মানুষদের ধরে এনে শান্তি নার্সারির কাছে হত্যা করা হয়। প্রায় ১৩০ জনের মৃত্যুর উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি ছিল একটি সংগঠিত গণহত্যা, যেখানে স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।

চেলোপাড়া কুয়া বধ্যভূমি

চেলোপাড়ার কুয়ার পাশে চার-পাঁচটি বদ্ধ কূপে মানুষকে জবাই করে ফেলে দেওয়া হতো বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। এসব কূপে পরবর্তীকালে নরকঙ্কাল পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

রেলওয়ে স্টেশন বধ্যভূমি

বগুড়া রেলস্টেশন ও সংলগ্ন এলাকা ১৯৭১ সালে কার্যত ‘কসাইখানা’-য় পরিণত হয়। এখানে আটক ব্যক্তিদের হত্যা করে লাশ সরিয়ে ফেলার জন্য স্টেশনের কূপ ও পরিত্যক্ত স্থাপনা ব্যবহার করা হতো। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্টেশনের সুইপার দাশীন জমাদার ৪০০–৫০০ মরদেহ কূপে ফেলেছিলেন। রেলপথের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাকিস্তানি বাহিনী এ স্থানকে দখল করে গণহত্যা ও লাশ গুমের কেন্দ্র বানায়।

রেলওয়ে স্টেশন বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, বগুড়া
রেলওয়ে স্টেশন বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, বগুড়া।

গাঙ্গুলি বাগান বধ্যভূমি

গাঙ্গুলি বাগান বগুড়া শহরের অন্যতম ভয়াবহ বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানি বাহিনী নিয়মিত এখানে বন্দিদের এনে হত্যা করত। সাধু বাবা যুগল কিশোর গোস্বামীর বর্ণনায় জানা যায়, বগুড়া দখলের পর আশ্রমের সাধুদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। সুন্দর সাধু, মঙ্গল সাধু ও মণীন্দ্রনাথ সরকারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আশ্রমসংলগ্ন বাগানের বদ্ধ কূপে বহু মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কূপে দীর্ঘদিন মানবকঙ্কাল ও খুলির অস্তিত্ব ছিল। গাঙ্গুলি বাগান বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধকালীন নগরভিত্তিক হত্যাযজ্ঞের এক শোকাবহ দলিল।

নওগাঁ জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

তাজ সিনেমা হল বধ্যভূমি

নওগাঁ সদর উপজেলার তাজ সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে একটি গোপন নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়। পুরোনো পশু হাসপাতাল অতিক্রম করে উত্তরে একটি ছোট মসজিদ ও তার পাশের দালানবাড়ি—যেখানে বসবাস করতেন বিহারি ব্যবসায়ী ইদ্রিস—এই স্থানগুলো স্থানীয়দের বর্ণনায় বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাড়ির দুটি ঘরে নির্মম হত্যার চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। এক ঘরে ঝুলন্ত দড়ি এবং অন্য ঘরে রক্তের দাগ দীর্ঘদিন দৃশ্যমান ছিল। অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা আটক বাঙালিদের এখানে এনে নির্যাতন ও জবাই করত। ঘরের জানালায় রক্তের ছাপ এবং পাশের কাঁচা কূপে নিক্ষিপ্ত মরদেহের স্মৃতি স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত। স্বাধীনতার পর এলাকাবাসী সেখানে অচেনা বহু বাঙালির লাশের সন্ধান পাওয়ার কথা জানান। স্থানটি আজও নৃশংসতার এক নীরব সাক্ষ্য।

আতাইকুলা গণকবর

নওগাঁ শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে ছোট যমুনা নদীর তীরবর্তী আতাইকুলা গ্রাম ২৫ এপ্রিল ১৯৭১ সালে এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং প্রায় ৮০ জন গ্রামবাসীকে আটক করে যোগেন্দ্রনাথ পালের বাড়ির আঙিনায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। দুপুরে দুই দফায় ব্রাশফায়ার করা হলে অনেকে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ২৮ জন গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে যান বলে জানা যায়। পরদিন ২৬ এপ্রিল ভবেশ্বর পালসহ স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোগ নিয়ে ৫২ জন শহীদের গণকবর সম্পন্ন করেন। আতাইকুলা গণকবর নওগাঁ অঞ্চলের অন্যতম প্রামাণ্য গণহত্যার স্মারক।

আতাইকুলা গণকবর, নওগাঁ
আতাইকুলা গণকবর, নওগাঁ।

পাঠশালা স্কুল বধ্যভূমি

নওগাঁ সদরের পাড় নওগাঁ পাঠশালা স্কুল সংলগ্ন এলাকা ১৯৭১ সালে নারীর প্রতি সংঘটিত বর্বরতার এক মর্মান্তিক উদাহরণ। স্থানীয় সূত্র ও স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৪ থেকে ৩০–৩৫ বছর বয়সী বহু তরুণীর মরদেহ এখানে পাওয়া যায়। এলাকাটিতে একটি বড় পানির কূপ ছিল, যার সংলগ্ন কক্ষে যুবতী নারীদের আটক রেখে দিনের পর দিন নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হতো। পরবর্তীতে অনেককে জবাই করে বা জীবন্ত অবস্থায় কূপে নিক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাধীনতার পর কূপ থেকে মানবদেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান। এই বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত সংগঠিত যৌন সহিংসতার একটি জ্বলন্ত সাক্ষ্য।

রউফ মিয়ার বাগান বধ্যভূমি

মরদুলা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পূর্বদিকে অবস্থিত রউফ মিয়ার বাগানও ১৯৭১ সালে হত্যাযজ্ঞের স্থান হিসেবে পরিচিত। নির্জন বাগান এলাকা হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এখানে আটক ব্যক্তিদের নিয়ে এসে গোপনে হত্যা করত বলে স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে। স্বাধীনতার পর এখানে গণকবরের চিহ্ন পাওয়া যায় বলে জানা যায়। যথাযথ অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের অভাবে স্থানটি এখন অনেকাংশে পরিবর্তিত হলেও ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ।

ডা. হাসানের বাড়ি বধ্যভূমি

ডা. হাসান আলীর বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত পরিত্যক্ত জমি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আলোচনায় আসে, যখন সেখানে অজস্র লাশের সন্ধান পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানান। ধারণা করা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা নির্জন এই স্থানে বহু মানুষকে হত্যা করে গোপনে দাফন করেছিল। বর্তমানে সেখানে জনবসতি গড়ে উঠলেও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী এই স্থান যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার দাবি রাখে।

দক্ষিণ পাড়া বধ্যভূমি, দোগাছি গ্রাম

নওগাঁ জেলার দোগাছি গ্রামের দক্ষিণ পাড়া ১৯৭১ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পিরোজপুর, খিদিরপুর, চণ্ডীপুর, রানীনগর থানার ত্রিমোহনী, নওগাঁ থানার বলিরঘাট, শিমুলিয়া, ইলিশবাড়ি ও সুলতানপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাকিস্তানি বাহিনী অসংখ্য বাঙালিকে ধরে এনে এখানে নৃশংসভাবে হত্যা করত। স্থানীয়দের মতে, বহু গণকবর এখানে ছড়িয়ে রয়েছে, যেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও সংরক্ষণ এখনো সম্পন্ন হয়নি।

দক্ষিণ পাড়া বধ্যভূমি, দোগাছি, নওগাঁ
দক্ষিণ পাড়া বধ্যভূমি, দোগাছি, নওগাঁ।

বলিহার ইউনিয়ন বধ্যভূমি

নওগাঁর বলিহার ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার চিহ্ন পাওয়া যায়। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে গোপনে দাফন করত বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। এসব বধ্যভূমি চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে ইতিহাস বিকৃত না হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক তথ্য জানতে পারে।

পাকুরিয়া বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ১২৮ জন মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করে বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত গণহত্যা, যার মাধ্যমে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। বহু লাশ গণকবরে দাফন করা হয় বলে জানা যায়।

পাকুরিয়া বধ্যভূমি, নওগাঁ
পাকুরিয়া বধ্যভূমি, নওগাঁ।

হালিমনগর বধ্যভূমি

নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার হালিমনগর এলাকায় ৩৬ জন আদিবাসী মানুষের গণকবর রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আদিবাসী জনগোষ্ঠীকেও রেহাই দেয়নি; সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয়দানের অভিযোগে গ্রাম আক্রমণ করে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। হালিমনগরের গণকবর মুক্তিযুদ্ধের বহুজাতিক ও সর্বজনীন চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

নাটোর জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

ফলবাগান বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে নাটোর শহর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এখানে তাদের ২ নম্বর সামরিক সেক্টরের কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। নাটোর শহরের ফলবাগান এলাকাটি তখন একটি নির্জন ও কৌশলগত স্থান হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী এটিকে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা—রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, নওগাঁসহ আশপাশের অঞ্চল থেকে মুক্তিকামী মানুষ ও সন্দেহভাজনদের ধরে এনে এখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। অনেককে গুলি করে, আবার অনেককে নির্যাতনের পর হত্যা করে গণকবরে দাফন করা হয়। ফলবাগান আজ মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার এক নীরব সাক্ষ্য।

ভাগার বধ্যভূমি

নাটোরের ভাগার এলাকা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর আরেকটি হত্যাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক বাঙালিদের এখানে এনে হত্যা করা হতো। এলাকাটি তুলনামূলক নির্জন হওয়ায় লাশ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া সহজ ছিল। বহু গণকবরের অস্তিত্বের কথা স্থানীয়ভাবে জানা যায়, যদিও সবগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রণীত হয়নি। ভাগার বধ্যভূমি উত্তরাঞ্চলে সংঘটিত সংগঠিত গণহত্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

নদীর পাড় কবরস্থান বধ্যভূমি

নাটোর শহরের নদীর পাড় কবরস্থানও মুক্তিযুদ্ধকালে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক মানুষকে এখানে এনে হত্যা করত এবং কবরস্থানের আড়ালে লাশ দাফন করত বলে স্থানীয়দের বর্ণনায় উঠে আসে। কবরস্থান হওয়ায় সেখানে নতুন কবর খোঁড়া বা মাটি উঁচু হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করা হতো—এই সুযোগেই হত্যাকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। স্বাধীনতার পর এলাকাটি গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ছাতনী গ্রাম বধ্যভূমি

নাটোরের ছাতনী গ্রাম ১৯৭১ সালের ৩ জুন এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, অবাঙালি হাফেজ আবদুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী গভীর রাতে গ্রামটি ঘিরে ফেলে। রাত প্রায় দুইটার দিকে অভিযান শুরু হয়; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গ্রামবাসীদের হাত বেঁধে একত্র করা হয়। ভোর পাঁচটা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি ও নির্যাতন চালানো হয়। প্রবীণ সাক্ষী নলিনীকান্তের ভাষ্যমতে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ৪৪২। এটি নাটোর অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ গণহত্যা হিসেবে পরিচিত, যা স্থানীয় জনজীবনে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে।

ছাতনী গ্রাম বধ্যভূমি, নওগাঁ
ছাতনী গ্রাম বধ্যভূমি, নওগাঁ।

রামপুরা খাল বধ্যভূমি, বনপাড়া

বনপাড়ার রামপুরা খালসংলগ্ন এলাকা ১৯৭১ সালে গণহত্যার এক বিভীষিকাময় স্থানে পরিণত হয়। ২ মে নিরাশ্রয় বহু নারী-পুরুষ ও শিশু নিকটবর্তী একটি মিশনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ৩ মে পাকিস্তানি পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর শেরওয়ানি এবং স্থানীয় সহযোগী হাফেজ আবদুর রহমানের নেতৃত্বে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। একই রাতে প্রায় ১৫৭ জনকে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। খালের ধারে লাশ ফেলে রাখা বা মাটিচাপা দেওয়া হয়। রামপুরা খাল উত্তরবঙ্গের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার এক মর্মন্তুদ স্মারক।

শহীদ সাগর বধ্যভূমি, গোপালপুর চিনিকল, লালপুর

লালপুর উপজেলার গোপালপুর উত্তরবঙ্গ চিনিকল এলাকা ৫ মে ১৯৭১ সালে এক নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়। পাকিস্তানি বাহিনী চিনিকলের প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায়; এর মধ্যে ৪৬ জন শহীদ হন। নিহতদের লাশ চিনিকলসংলগ্ন পুকুরপাড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আরও বহু মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর পুকুর ও আশপাশের স্থান থেকে অসংখ্য শহীদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে পুকুরটির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ সাগর’, যা আজ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক স্থান।

গোপালপুর চিনিকল বধ্যভূমি, নওগাঁ
গোপালপুর চিনিকল বধ্যভূমি, নওগাঁ।

বাওড়া রেলওয়ে ব্রিজ বধ্যভূমি, লালপুর

আজিমনগর ও আবদুলপুরের মাঝামাঝি অবস্থিত বাওড়া রেলওয়ে ব্রিজ মুক্তিযুদ্ধকালে ‘মহাশ্মশান’ নামে পরিচিতি পায়। আবদুলপুর, মালঞ্চি, আড়ানী, লোকমানপুর, ইয়াছিনপুর, গোপালপুর, ঈশ্বরদী ও নাটোরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক গণবন্দীদের এখানে এনে হত্যা করা হতো। অনেকের হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় গুলি করা হয়; কারও শরীরে বেয়নেটের আঘাত বা গলা কাটা চিহ্ন পাওয়া যায় বলে স্থানীয়রা জানান। লাশগুলো নদীর স্রোতে ভেসে গেলেও কিছু মরদেহ তীরে আটকে থাকত। বাওড়া ব্রিজ উত্তরাঞ্চলে সংঘটিত পরিকল্পিত গণহত্যার এক ভয়াবহ প্রতীক।

সিরাজগঞ্জ জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

হরিণাগোপাল ও বাগবাটি গ্রাম বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ৩১ মে হরিণাগোপাল ও বাগবাটি গ্রাম পাকিস্তানি বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণের শিকার হয়। প্রত্যক্ষদর্শী মঙ্গল মালাকারের ভাষ্যমতে, পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় প্রথমে বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদ অফিস সংলগ্ন স্থান থেকে গুলি চালায় এবং পরে গ্রামে প্রবেশ করে ঘুমন্ত মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি ও নির্যাতন চালায়। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে। বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮০ জন শহীদের তথ্য পাওয়া গেলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞ পুরো অঞ্চলে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং বহু পরিবার চিরতরে ভেঙে যায়।

বাগবাটি গ্রাম বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, সিরাজগঞ্জ
বাগবাটি বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, সিরাজগঞ্জ।

লঞ্চঘাট বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে সিরাজগঞ্জ লঞ্চঘাট ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি কৌশলগত অবস্থান। যমুনা নদীপথ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হওয়ায় লঞ্চঘাট দখলে রাখা ছিল তাদের সামরিক পরিকল্পনার অংশ। এই স্থানটিকে তারা আটক ও নির্যাতনের পর হত্যাকাণ্ড পরিচালনার উপযুক্ত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা-সমর্থক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী এবং সন্দেহভাজন সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এখানে নির্মমভাবে জবাই বা গুলি করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, যাতে প্রমাণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ ভাটির অঞ্চলে গিয়ে উদ্ধার হওয়ার ঘটনাও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে। লঞ্চঘাট তাই স্থানীয় মানুষের কাছে ‘কসাইখানা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং এটি সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের গণহত্যার এক মর্মন্তুদ স্মারক।

সাবজেল বধ্যভূমি

সিরাজগঞ্জ মহকুমা সাবজেল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রশাসনিক ভবনকে তারা অস্থায়ী কারাগার ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা-সমর্থক এবং প্রগতিশীল ব্যক্তিদের আটক করে এখানে আনা হতো। নির্যাতনের মধ্যে ছিল মারধর, বৈদ্যুতিক শক, অনাহারে রাখা এবং শারীরিক নির্যাতনের অন্যান্য পদ্ধতি। অনেক বন্দিকে আর জীবিত ফিরে যেতে দেখা যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, সাবজেলের ভেতরে ও সংলগ্ন এলাকায় গোপনে লাশ দাফন করা হতো। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে মানবদেহাবশেষ পাওয়ার কথাও প্রচলিত রয়েছে। সাবজেল বধ্যভূমি প্রমাণ করে যে দখলদার বাহিনী প্রশাসনিক কাঠামোকেও সন্ত্রাসের যন্ত্রে রূপান্তর করেছিল।

বাবতী বধ্যভূমি

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাবতী গ্রাম ১৯৭১ সালের মে মাসে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামটি ঘিরে ফেলে এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৭০ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। অনেককে বাড়ি থেকে টেনে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। একই সঙ্গে অগ্নিসংযোগ চালিয়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ফলে গ্রামবাসীরা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। নারী ও শিশুরাও এই বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। লাশ দ্রুত দাফন বা গোপন স্থানে ফেলে রেখে হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বাবতী বধ্যভূমি গ্রামভিত্তিক পরিকল্পিত গণহত্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

বরইতলা বধ্যভূমি

কাজীপুর উপজেলার বরইতলা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা চালায়। স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়, প্রায় দুই শতাধিক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রায় ২০০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ধরন ছিল অত্যন্ত নির্মম—অনেককে ঘর থেকে বের করে গুলি করা হয়, আবার কেউ কেউ আগুনে পুড়ে প্রাণ হারান। এই ঘটনা শুধু মানবিক বিপর্যয়ই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও এলাকাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। বরইতলা বধ্যভূমি কাজীপুর অঞ্চলে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধকালীন বর্বরতার অন্যতম স্মারক।

শাহজাদপুর গণকবর, গাড়াদহ গ্রাম

শাহজাদপুর উপজেলার গাড়াদহ ইউনিয়নের গাড়াদহ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে স্বাধীনতার পর একটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। মালিক আজিম প্রামাণিকের পরিত্যক্ত বাড়ির জমিতে মাটি কাটার সময় কয়েক ফুট নিচ থেকে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, খুলি ও হাড়গোড় বেরিয়ে আসে। স্থানীয়দের ধারণা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা এখানে আটক মানুষদের হত্যা করে গোপনে দাফন করেছিল। ঘটনাটি এলাকায় গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং স্থানটি গণকবর হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই আবিষ্কার মুক্তিযুদ্ধের অজানা বহু অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে।

উত্তর আলোকদিয়া বধ্যভূমি

উত্তর আলোকদিয়া শ্মশানসংলগ্ন এলাকা ১৯৭১ সালে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শ্মশান এলাকা হওয়ায় সেখানে নতুন করে মাটি খোঁড়া বা দাফন কার্যক্রম সন্দেহের উদ্রেক করত না—এই সুযোগে পাকিস্তানি বাহিনী আটক মানুষদের হত্যা করে মাটিচাপা দেয় বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণকবরের চিহ্ন শনাক্ত করা হয়। অনেক পরিবার আজও নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে এই স্থানটির দিকে ফিরে তাকায়। উত্তর আলোকদিয়া বধ্যভূমি সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী সাক্ষ্য।

পাবনা জেলার বধ্যভূমি

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

ওয়াপদা পাওয়ার হাউস বধ্যভূমি

ওয়াপদা অফিস প্রাঙ্গণ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখানে আটক বাঙালিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো এবং রাতের অন্ধকারে লাশ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে খননকাজ চালিয়ে অসংখ্য গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া নরকঙ্কাল, পোশাক ও ব্যক্তিগত সামগ্রী সেই নির্মমতার নীরব সাক্ষ্য বহন করে। ঝাড়ুদার ভানুলাল অন্তত ১৬টি নরকঙ্কাল নিজ চোখে গণনা করেছিলেন বলে জানা যায়। স্থানটি আজও গণহত্যার এক করুণ স্মারক।

বংশীপাড়া গণকবর

জেলার আটঘরিয়া উপজেলায় মাজপাড়া বংশীপাড়া ঘাটের (শহীদ কালাম নগর) অবস্থান। ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর ওই ঘাটে মুক্তিযোদ্ধা, গ্রামাবাসীর সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট ৪০ জন সাধারণ গ্রামবাসী শহীদ হন।

বংশীপাড়া গণকবর, পাবনা
বংশীপাড়া গণকবর, পাবনা।

বিসিক শিল্পনগরী বধ্যভূমি

পাবনার বিসিক শিল্পনগরী ছিল পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের পরিচালিত এক ভয়াল হত্যাক্ষেত্র। বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা নিরীহ মানুষদের এখানে জড়ো করে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হতো। বহু পরিবার এখানেই চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাজার হাজার মানুষ এ স্থানে প্রাণ হারান এবং তাদের লাশ তড়িঘড়ি করে পুঁতে ফেলা হয়। স্বাধীনতার পর মাটি খুঁড়ে অসংখ্য কঙ্কাল ও আলামত উদ্ধার হয়, যা এ স্থানের গণহত্যার ভয়াবহতা প্রমাণ করে।

নাগা ডেমরা বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের জুন মাসে হিন্দু অধ্যুষিত নাগা ডেমরা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিত হামলা চালায়। ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের টেনে বের করে আনা হয়। অনেককে গ্রামের পাশের খাদ ও নির্জন স্থানে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রামটি প্রায় ৪০০ প্রাণহানির শিকার হয়। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মাধ্যমে পুরো জনপদকে জনশূন্য করে দেওয়া হয়। এ ঘটনা ছিল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ।

নগরবাড়ি ঘাট বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি বাহিনী নগরবাড়িতে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে এবং নদীপথ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ ঘাঁটি থেকে আশপাশের গ্রামগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হতো। নগরবাড়ি ঘাটে ধরে আনা মানুষদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো এবং অনেক লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। নদীর তীরবর্তী এ স্থানটি অল্প সময়েই এক নীরব বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর স্থানীয়রা এখানে গণকবরের চিহ্ন শনাক্ত করেন।

রূপসী বধ্যভূমি

রূপসী এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেয়। স্বাধীনতার পর অনুসন্ধানে প্রায় ৩০০ মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয় বলে জানা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতে ট্রাকভর্তি বন্দিদের এনে এখানে গুলি করা হতো। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকলেও পরবর্তীতে এলাকাবাসীর উদ্যোগে স্থানটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণের দাবি ওঠে।

শহীদনগর ডাববাগান গণকবর

রাজধানী ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শহীদনগর ডাববাগান। এ স্থানে ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধা, গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিস্তনি হানাদার বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১৯ জন ইপিআরসহ প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ গ্রামাবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ডাববাগানের এ যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে এ গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করা হয়েছে।

শহীদনগর ডাববাগান গণকবর, পাবনা
শহীদনগর ডাববাগান গণকবর, পাবনা।

রেলওয়ে পাম্প হাউস বধ্যভূমি

ঈশ্বরদীর পরিত্যক্ত রেলওয়ে পাম্প হাউস ছিল একটি প্রধান নির্যাতনকেন্দ্র ও বধ্যভূমি। আটক ব্যক্তিদের এখানে এনে অমানবিক অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করা হতো। শহীদদের লাশ স্তূপাকারে ফেলে রাখা হতো অথবা কাছাকাছি স্থানে গোপনে পুঁতে ফেলা হতো। স্বাধীনতার পর এখানে অসংখ্য হাড়গোড় ও কঙ্কাল পাওয়া যায়, যা এ স্থানের বিভীষিকাময় ইতিহাস তুলে ধরে।

পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ বধ্যভূমি

পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে ও বিভিন্ন স্প্যানে গণহত্যার অসংখ্য আলামত পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের মতে, অনেক নারী-পুরুষকে ব্রিজের ওপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হতো অথবা কাছাকাছি স্থানে গুলি করে হত্যা করা হতো। স্বাধীনতার পর কঙ্কাল, শাড়ি, ব্লাউজ ও জুতা উদ্ধার হয়, যা নারীদের ওপর সংঘটিত সহিংসতারও ইঙ্গিত বহন করে। এ স্থানটি নদী ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি গণহত্যার এক নির্মম স্মারক হয়ে আছে।

মাঝদিয়া গ্রাম বধ্যভূমি

১১ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা ঈশ্বরদী দখল করে এবং মাঝদিয়া ও মাছপাড়া গ্রামে অভিযান চালায়। ২২ এপ্রিল ভোরে গ্রামজুড়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে পালানোর পথ বন্ধ করে নিরীহ মানুষদের হত্যা করা হয়। প্রায় ৫০০ মানুষ নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং বহু পরিবার চিরতরে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

করমজা গণকবর

সাঁথিয়ার করমজা গ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে আটজন শহীদকে একত্রে দাফন করা হয়েছিল। এছাড়াও স্থানীয় কৃষি ফার্ম এলাকাতেও আরেকটি গণকবর চিহ্নিত হয়। দীর্ঘদিন অচিহ্নিত অবস্থায় থাকা এসব কবর মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার প্রমাণ বহন করে। এলাকাবাসী পরবর্তীতে স্মৃতিফলক স্থাপনের দাবি জানান।

ফতে মোহাম্মদপুর বধ্যভূমি

মোহাম্মদপুরে দুটি পৃথক বধ্যভূমির অস্তিত্ব পাওয়া যায়—একটি পুরুষদের জন্য এবং অন্যটি নারী ও শিশুদের জন্য। ১৯৭১ সালের ১২-১৩ এপ্রিল বৃদ্ধ আবদুল জব্বারের পরিবারসহ মোট ৩১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত ও প্রতিশোধপরায়ণতার বহিঃপ্রকাশ। স্বাধীনতার পর গণকবর উন্মোচিত হলে ঘটনাটির ভয়াবহতা প্রকাশ পায়।

নাজিরপুর গণহত্যা

১ ডিসেম্বর নাজিরপুরে পাকিস্তানি বাহিনী ৬২ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এ হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও এডওয়ার্ড কলেজ, হিমাইতপুর, কৃষ্ণপুর, হাদল ও সাতবাড়িয়া বধ্যভূমিতেও বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। এসব স্থান আজও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিকে ধারণ করে আছে এবং যথাযথ সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

রেহাইচর বধ্যভূমি ও গণকবর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের অদূরে রেহাইচর গ্রামটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বধ্যভূমিতে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে প্রবেশ করে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে এবং বিভিন্ন গ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, ছাত্র, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করত। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এখানেই সংঘটিত যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মোহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে শহীদ হন, যা এই এলাকাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। স্বাধীনতার পর স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে এখানে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায় এবং এটি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত হয়।

রেহাইচর বধ্যভূমি ও গণকবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
রেহাইচর বধ্যভূমি ও গণকবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

শ্মশানঘাট বধ্যভূমি, শিবগঞ্জ

মহানন্দা নদীর তীরবর্তী নবাবগঞ্জ শ্মশানঘাট মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম নির্মম হত্যাস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পাকিস্তানি সেনারা এবং তাদের সহযোগী রাজাকাররা শহরের তরুণ, ছাত্র এবং স্বাধীনতার সমর্থকদের আটক করে এখানে নিয়ে আসত। অনেককে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা উল্লেখ করেছেন। পরে মৃতদেহগুলো মহানন্দা নদীতে ফেলে দেওয়া হতো যাতে হত্যার প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। এই বধ্যভূমিটি আজও মুক্তিযুদ্ধের বর্বরতার একটি ঐতিহাসিক স্মারক।

বারোঘরিয়া গণকবর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারোঘরিয়া ইউনিয়নের প্রাচীন জমিদার কাচারীবাড়ির সামনে অবস্থিত বটগাছের নিচে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি বড় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা এই এলাকায় অভিযান চালিয়ে বহু নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে এবং তাদের মৃতদেহ একটি বড় গর্তে মাটিচাপা দেয়। স্থানীয় গবেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় এই এলাকাটি একটি অস্থায়ী আটক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। স্বাধীনতার পর স্থানীয় মানুষ গণকবরের বিষয়টি চিহ্নিত করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর অনেক অংশ বিলীন হয়ে গেছে।

রহনপুর স্টেশনপাড়া বধ্যভূমি ও গণকবর

গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর এলাকায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। বিভিন্ন গ্রাম থেকে আটককৃত মানুষদের রহনপুর স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় এনে বন্দি রাখা হতো এবং তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মৃতদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। বর্তমানে এই স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে যা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

গোমস্তাপুর গণকবর

গোমস্তাপুর থানাসংলগ্ন খালের পাড়ে অবস্থিত এই গণকবরটি ২৩ এপ্রিল ১৯৭১ সালের এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হিন্দুপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অন্তত ৩৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে আসে। পরে তাদের খালের পাড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয় এবং মৃতদেহ সেখানেই মাটিচাপা দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যার অন্যতম নৃশংস উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

পোড়াগ্রাম গণকবর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের পোড়াগ্রাম ও দশরশিয়া গ্রামে ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী ভয়াবহ হামলা চালায়। তারা গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। স্থানীয় সূত্র এবং গবেষণা অনুযায়ী, এই হামলায় প্রায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং তাদের অনেককে বিভিন্ন স্থানে গণকবরের মধ্যে দাফন করা হয়। এই গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।

কাশিমপুর বধ্যভূমি

কাশিমপুর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আরেকটি বধ্যভূমি। এখানে বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হতো।

দোবশিয়া গ্রাম বধ্যভূমি

দোবশিয়া গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য লোককে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করত।

কালুপুর বধ্যভূমি

কালুপুর পাকিস্তানি বাহিনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বধ্যভূমি।

সোনামসজিদ গণকবর

শিবগঞ্জ থানার সোনামসজিদ ও দাখিল দরওয়াজা সীমান্তের মধ্যবর্তী স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে গণকবরটি আবিষ্কৃত হয়।

সোনামসজিদ গণকবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
সোনামসজিদ গণকবর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

ময়মনসিংহ জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

বড়বাজার কালীবাড়ি বধ্যভূমি

ময়মনসিংহ শহরের বড় বাজার এলাকায় অবস্থিত কালীবাড়িটি একটি পরিচিত বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত। কালীবাড়ির একটি কক্ষে দুটি চওড়া কাঠের টুকরা উদ্ধার করা হয়, যেগুলোর ওপর জমাট বাঁধা রক্তের দাগ স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। ধারণা করা হয়, এই কাঠের টুকরাগুলোর ওপর শুইয়ে নিরীহ বাঙালিদের নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করা হতো। কালীবাড়ির পাশের পুকুর থেকেও অসংখ্য নরকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া, কালীবাড়ির নিকটে অবস্থিত দুটি কুয়ো সম্পূর্ণভাবে মানুষের লাশে পরিপূর্ণ ছিল। এই কুয়োগুলোতে নরকঙ্কাল, গলিত মৃতদেহ, বিচ্ছিন্ন মস্তক, খণ্ডিত দেহাংশ, জমাট বাঁধা রক্ত এবং অসহনীয় দুর্গন্ধ একসাথে মিশে ছিল। ঠিক কত সংখ্যক মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়েছিল তা নির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও ধারণা করা হয়, পাঁচশোরও বেশি মানুষ এই স্থানে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন।

বড়বাজার কালীবাড়ি বধ্যভূমি, ময়মনসিংহ
অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে শহরের কালিবাড়ী বধ্যভূমি, ময়মনসিংহ।

ময়মনসিংহ শহরের ডাকবাংলো, নিউমার্কেট, কেওয়াটখালী রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন এলাকা এবং নদীর তীরবর্তী স্থানগুলোতেও একাধিক বধ্যভূমির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এসব স্থান থেকে সহস্রাধিক মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। শহরের সাহেব কোয়ার্টার এলাকায় অবস্থিত একটি পুকুর থেকে বাক্সভর্তি নরকঙ্কাল পাওয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। শহরের নিকটবর্তী কাচারি ঘাট এলাকায়ও একটি বধ্যভূমি রয়েছে, যেখানে নিহত অধিকাংশ বাঙালির মৃতদেহ নদীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ডাকবাংলোর পাশের নদীর তীর থেকেও বহু নরকঙ্কাল ও মানুষের খুলি উদ্ধার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ডাকবাংলো এলাকায় আলবদর বাহিনীর একটি ক্যাম্প স্থাপিত ছিল, যেখান থেকে এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হতো বলে ধারণা করা হয়।

ডাকবাংলো বধ্যভূমি

ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহাসিক ডাকবাংলো এলাকাটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ দিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনী এখানে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং এখান থেকেই শহরের বিভিন্ন স্থানে দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করত। অনেক নিরীহ মানুষকে ধরে এনে ডাকবাংলোতে আটক রাখা হতো এবং পরে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। স্বাধীনতার পরে ডাকবাংলোর পাশের নদীতীরে খননকাজের সময় অসংখ্য নরকঙ্কাল, মানুষের হাড়গোড় এবং মাথার খুলি পাওয়া যায়, যা এই স্থানটিকে মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে।

ডাকবাংলো বধ্যভূমি, ময়মনসিংহ
অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে জেলা পরিষদ সংলগ্ন ডাকবাংলো বধ্যভূমি ও গণকবর, ময়মনসিংহ।

নিউমার্কেট বধ্যভূমি

ময়মনসিংহ শহরের নিউমার্কেট এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভয়াবহ হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালি তরুণ, ছাত্র, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এখানে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানোর পর গুলি করে হত্যা করা হতো এবং তাদের মৃতদেহ গোপনে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হতো। স্বাধীনতার পর এলাকাটি খননকালে শত শত মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়, যা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে নিউমার্কেট এলাকাটি মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি বৃহৎ বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

কেওয়াটখালি রেলওয়ে কলোনি বধ্যভূমি

কেওয়াটখালী রেলওয়ে কলোনি বধ্যভূমি (ময়মনসিংহ সদর) ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত। এটি মূলত বিহারি অধ্যুষিত একটি এলাকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজাকার, আলশামস ও আলবদর বাহিনী স্থানীয় বিহারিদের সহযোগিতায় এই কলোনিটিকে একটি বধ্যভূমিতে রূপান্তরিত করে। এখানে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে ধরে এনে অমানবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন হিসেবে পরিচিত। এই স্টেশনে বাঙালিদের তুলনায় অবাঙালি বিহারি শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ছিল বেশি। রেলপথে চলাচলের সময় ভাষাগত সাদৃশ্যের কারণে এসব বিহারিদের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে আলবদর, রাজাকার, আলশামস ও বিহারিরা সম্মিলিতভাবে গণহত্যায় লিপ্ত হয়। মানুষ হত্যার জন্য তারা ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এই কলোনিটিকেই উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক এবং নিরীহ সাধারণ মানুষকে এখানে ধরে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো।

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের কাছারিঘাট বধ্যভূমি

কেওয়াটখালি রেলওয়ে কলোনি বধ্যভূমি ও গণকবর, ময়মনসিংহ
কেওয়াটখালি রেলওয়ে কলোনি বধ্যভূমি ও গণকবর, ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ।

৩০শে নভেম্বর গৌরীপুর থানার পলাশকান্দা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ওই যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ, মঞ্জুসহ অনেক গ্রামবাসীকে পাকসেনারা আটক করে কেওয়াটখালী রেলওয়ে কলোনিতে নিয়ে আসে। পরে তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে বিহারি আলশামস বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। তখন তাদের অধিকাংশই ছিল অর্ধমৃত অবস্থায়। তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। কারো কারো আঙুল, কান ও যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়, আবার কয়েকজনের চোখ উপড়ে নেওয়া হয়। এই নির্যাতনের সময় বিহারিরা পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠত। অবশেষে নির্যাতন শেষে তাদের হত্যা করা হয়।

ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী কাছারিঘাট মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে আটককৃত মানুষদের এখানে নিয়ে এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো। অনেক সময় বন্দিদের নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো এবং তাদের মৃতদেহ ব্রহ্মপুত্র নদে ফেলে দেওয়া হতো যাতে হত্যার প্রমাণ মুছে ফেলা যায়। স্থানীয়দের মতে, ১৯৭১ সালের পুরো সময়জুড়েই এই এলাকায় বারবার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষ এখানে শহীদ হয়েছেন।

সাহেবপাড়া বধ্যভূমি

ময়মনসিংহ শহরের সাহেবপাড়া কোয়ার্টার এলাকাও মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার এক নীরব সাক্ষী হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর এলাকাটির একটি পুকুর থেকে বাক্সভর্তি বিপুল পরিমাণ নরকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী, পাকিস্তানি বাহিনী শহর ত্যাগের আগে তাদের অপরাধের প্রমাণ আড়াল করার উদ্দেশ্যে মৃতদেহগুলো টুকরো টুকরো করে বাক্সে ভরে পুকুরে নিক্ষেপ করেছিল। এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্মমতার একটি জ্বলন্ত ও ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

শালীহর গণহত্যা

১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার শালীহর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী একটি বিশেষ সামরিক ট্রেনে করে এসে আকস্মিক হামলা চালায়। শালীহর ছিল একটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম, তাই পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা সেখানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায়। এই হামলায় অন্তত ১৪ জন গ্রামবাসী নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন হিন্দু এবং একজন মুসলমান। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন নগেন্দ্র চৌকিদার। অনেক গ্রামবাসী আহত হন এবং অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে আশপাশের এলাকায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই ঘটনাটি শালীহর গণহত্যা নামে পরিচিত এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

শালীহর গণহত্যা

মুক্তাগাছার দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের বধ্যভূমি

দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের শহীদ পরিবারের সন্তান এবং গুলিবিদ্ধ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জবান আলী (৭৫) জানান, ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা তাদের গ্রামে আক্রমণ চালায়। ওই হামলায় তার পরিবারের সাতজন সদস্যসহ মোট ১৮ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগে বধ্যভূমিটি শনাক্ত করে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই স্মৃতিস্তম্ভে এখনো শহীদদের কারও নামের তালিকা সংযোজন করা হয়নি।

মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২ আগস্ট সোমবার স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী মুক্তাগাছার গোটা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নারী-শিশু ও হিন্দু পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। পর অগ্নিসংযোগ করে গ্রামের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। একাত্তরে এটিই ছিল একদিনে মুক্তাগাছায় সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, ওই দিনে হত্যা করা হয় ২৫৩ জনকে।

হালুয়াঘাট তেলিখালী গণকবর

৩ নভেম্বর হালুয়াঘাট সীমান্তে অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাদের তেলিখালী ক্যাম্প দখলকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তীব্র সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। মাত্র পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আটজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনীর ২১ জন সদস্য শহীদ হন। পরবর্তীতে এই বীর শহীদদের তেলিখালী এলাকায় একত্রে গণকবরে দাফন করা হয়। তাদের স্মরণে সেখানে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হলেও দুঃখজনকভাবে সেটি বর্তমানে অযত্ন ও অবহেলার মধ্যে পড়ে রয়েছে।

হালুয়াঘাট তেলিখালী গণকবর স্মৃতিসৌধ, ময়মনসিংহ
হালুয়াঘাট তেলিখালী গণকবর স্মৃতিসৌধ, ময়মনসিংহ।

জামালপুর জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

জামালপুর শহরের গণহত্যা

২২ এপ্রিল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী জামালপুর শহরে প্রবেশ করে। দিগপাইত থেকে পাথালিয়া পর্যন্ত রাস্তার দুপাশের দোকানপাট ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়, মন্দির ভেঙে দেয়। গোলাগুলিতে ৭০-৭২ জন নিরস্ত্র মানুষ নিহত হন।

জামালপুর শহরের শহীদদের তালিকাসহ স্মৃতিসৌধ, জামালপুর
জামালপুর শহরের শহীদদের তালিকাসহ স্মৃতিসৌধ, জামালপুর।

শহীদ নগর গণহত্যা

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে সরিষাবাড়ী উপজেলার বারইপটল ও ফুলদহেরপাড়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদারদের যুদ্ধে ১০ জন শহীদ হন। ৬০ জন নিরীহ গ্রামবাসীও নিহত হন।

বকসীগঞ্জ গণকবর

বকসীগঞ্জ ইউনিয়নে অসংখ্য গণকবর পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে কিছু কবর থেকে ৫০-৬০টি লাশ উদ্ধার করা হয়। কিছু কবর দুর্গন্ধের কারণে খোঁড়া যায়নি।

শ্মশানঘাট বধ্যভূমি

জামালপুরের শ্মশানঘাটে নিয়মিত গণহত্যা সংঘটিত হতো। এখানে পাকিস্তানি সেনা ও সহযোগীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঙালিকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করত।

পিটিআই ক্যাম্প বধ্যভূমি

পিটিআই ক্যাম্পে শান্তি কমিটির সহযোগিতায় বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে কখনো গুলি করে, আবার কখনো জবাই বা আঘাত করে হত্যা করা হতো।

কলেজ ক্যাম্প বধ্যভূমি

কলেজ ক্যাম্পে রাজাকাররা অসংখ্য নিরস্ত্র-নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে অমানবিক নির্যাতন ও হত্যা করত।

বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী দেওয়ানগঞ্জে তৎকালীন রেলওয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাটে স্বাধীনতাকামী অসংখ্য মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। কত নারীর সম্ভ্রম হরণ করেছে, কত শিশুকে হত্যা করেছে তার হিসাব নেই। পাক সেনারা বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের ধরে এনে চোখ-হাত বেঁধে ট্রেনে তুলে নিয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাটে জড়ো করত। এরপর রেলওয়ে জেটিতে দাঁড় করিয়ে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করত। নিহতদের পেট কেটে লাথি দিয়ে যমুনায় ফেলে দিয়েছে, যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। এ সময় যমুনার পানি রক্তে লাল হয়ে যেত। ১০-১২ হাজার স্বাধীনতাকামী লোকজনকে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাহাদুরাবাদ ঘাটে পৌঁছেই প্রথমে ৭০ বছরের বিজয় সিং ও ঘাটের স্টেশন মাস্টার আবদুল্লাহকে হত্যার মধ্য দিয়ে গণহত্যা শুরু করে।

সে সময় বাহাদুরাবাদ ঘাটে কিভাবে মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয় জানতে চাইলে সাত সন্তানের জননী শত বছরের বৃদ্ধা মরিয়ম বেওয়া বলেন, ‘আমি হেই কতা এহন আর কইতে পারুম না, বুক ফাইটা যায়, কুরাইনা ট্রেনে করে মানুষ ধইরা আইনে ওয়াগন হুর্দ্দে ডুবাইয়া দিত, এহানে মাটি খুঁড়লে মালগাড়ির ওয়াগনে মানুষের হাড়গোড় পাওয়া যাইব’ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি ও তার ছেলে লাল মিয়া নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দেন যেসব স্থানে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে ওয়াগন। সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ রফিকুল হক জানান, তার পিতা শেখ খয়েজ উদ্দিন, চাচাতো ভাই মাওলানা আনোয়ার হোসেনকে জেটিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করলে, তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে রক্ষা পান, এ ঘাটে কম করে হলেও ৮-১০ হাজার নিরীহ লোককে হত্যা করা হয়।

পৌরসভার পাশে যমুনা নদীর পাড়ে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জামালপুর
পৌরসভার পাশে যমুনা নদীর পাড়ে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জামালপুর।

পিয়ারপুর কবরস্থান বধ্যভূমি

পিয়ারপুর কবরস্থানের নিকট নদীর ঘাটে অনেককে হত্যা করা হয়েছিল।

আশেক মাহমুদ কলেজ হোস্টেল বধ্যভূমি

সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের স্নাতক হোস্টেল ছিল আলবদর বাহিনীর ক্যাম্প। এখানে বহু লোককে ধরে এনে কলেজ এলাকায় জবাই করে হত্যা করা হতো।

আশেক মাহমুদ কলেজ হোস্টেল বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জামালপুর
আশেক মাহমুদ কলেজ হোস্টেল বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, জামালপুর।

নেত্রকোনা জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

ঘাঘটিয়া নদীতীর বধ্যভূমি

ধোবাউড়া উপজেলার তারাইকান্দি গ্রামের ঘাঘটিয়া নদীর তীর বধ্যভূমিতে মুক্তিগামী মানুষদের ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। এখানে প্রায় ৫০-৫৫ জনকে হত্যা করা হয়। গ্রামে ফিরে দেখলে নদীর তীরে রশিতে বাঁধা গুলিবিদ্ধ শত শত লাশ পড়ে থাকত।

মগড়া নদী সেতু বধ্যভূমি

মগড়া নদীর সেতু বধ্যভূমিতে মানুষদের সেতুর ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো এবং মৃতদেহ নদীতে ফেলা হতো। স্বাধীনতার পর এখানে অনেক নরকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে।

মগড়া নদী সেতু বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, নেত্রকোনা
মগড়া নদী সেতু বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ, নেত্রকোনা।

ধুলদিয়া রেলওয়ে সেতু বধ্যভূমি

গচিহাটা রেলস্টেশনের কাছে ধুলদিয়া রেলওয়ে সেতু বধ্যভূমিতে বহু মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে সুধীর জীবন বীর, শশাংক জীবন বীর, শৈবাল জীবন বীর, বিপুল জীবন বীর, বাদল জীবন বীর, অরুণ চন্দ্র রায় প্রমুখ রয়েছেন।

পূর্বধলা ত্রিমোহিনী বধ্যভূমি

৭১’র ২২ সেপ্টেম্বর পূর্বধলার ত্রিমোহিনীতে সবচেয়ে বড় হত্যাজজ্ঞ ঘটেছিল। সেদিন হানাদাররা সুরেশ সাহা, সতীস সরকার, স্বদেশ দত্তসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫জন নিরিহ মানুষকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করেছিল।

পূর্বধলা ত্রিমোহিনী বধ্যভূমি, নেত্রকোনা
পূর্বধলা ত্রিমোহিনী বধ্যভূমি, নেত্রকোনা।

কিশোরগঞ্জ জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

ইটনা হাওর বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর মিঠামইনের ধোবাজুরা গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা আক্রমণ চালিয়ে ১৮ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে ইটনা হাওরে গুলি করে হত্যা করে। শহীদদের মধ্যে রয়েছেন রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া, আবদুল গণি ভূঁইয়া, আবদুল রউফ ভূঁইয়া, আবদুল মজিদ ভূঁইয়া, আবদুল মতিন ভূঁইয়া, আবদুল রাশিদ ভূঁইয়া প্রমুখ।

নীলগঞ্জ বাজার ব্রিজ বধ্যভূমি

নীলগঞ্জ ব্রিজ বধ্যভূমি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজথাপন ইউনিয়নে অবস্থিত। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বদিকে নীলগঞ্জ বাজারের অবস্থান। এ বাজারের শেষ মাথায় নরসুন্দা নদীর ওপর একটি ব্রিজ রয়েছে। এটি নীলগঞ্জ ব্রিজ নামে পরিচিত। এ ব্রিজ থেকে তাড়াইল উপজেলার সীমানা শুরু। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানি সেনারা এ ব্রিজে প্রায় ৩০ জন নিরীহ মানুষকে বিভিন্ন সময়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এখানে নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন— আহম্মদ আলী (পিতা মো. ফজর আলী, হয়বতনগর, কিশোরগঞ্জ শহর), গোপাল চন্দ্ৰ বৰ্মণ (পিতা নীলমোহন বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ), সুভাষ চন্দ্ৰ বর্মণ (পিতা নীলমোহন বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ), যুধিষ্ঠির বর্মণ (পিতা নীলমোহন বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ), হলধর বর্মণ (পিতা পরমেশ্বর বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ), মুকুন্দ বর্মণ (পিতা পবন চন্দ্র বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ), কেবল চন্দ্র গোস্বামী (পিতা বোধরাম বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ) ও সজনী বর্মণ (পিতা সনাতন বর্মণ, বেপারীপাড়া, নীলগঞ্জ)।

নীলগঞ্জ বাজার ব্রিজ বধ্যভূমি, কিশোরগঞ্জ
নীলগঞ্জ বাজার ব্রিজ বধ্যভূমি, কিশোরগঞ্জ ।

কালীগঞ্জ ব্রিজ বধ্যভূমি

কালীগঞ্জ ব্রিজ এলাকায় অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছিল। শহীদদের মধ্যে আবদুল হেকিম, রাধাকান্ত দাস, গৌর গোপাল দাস, সুধাংশু রঞ্জন দাস প্রমুখ ছিলেন।

কুড়িঘাটা নদীর পাড় বধ্যভূমি

১৫ আগস্ট ১৯৭১ রাতে কিশোরগঞ্জের কয়েকটি গ্রামে হামলা চালিয়ে প্রায় ২৫ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে কুড়িঘাটা নদীর পাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। শহীদদের মধ্যে সতীশ চন্দ্র সরকার, রবি চন্দ্র সরকার, খোকন চন্দ্র দত্ত প্রমুখ ছিলেন।

বড়ইতলা গ্রাম বধ্যভূমি

১৫ অক্টোবর ১৯৭১ সালে কিশোরগঞ্জের যশোদল ইউনিয়নের বড়ইতলায় পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের সহায়তায় ধৃত গ্রামবাসীকে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেললাইনের পাশে দাঁড় করিয়ে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে হত্যা করে। আনুমানিক ৩৬৫ জন শহীদ হয়। ১৪৪ জনের নামের তালিকা পাওয়া গেছে।

সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাট বধ্যভূমি

সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাটে বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষকে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। শহীদদের মধ্যে মহিউদ্দিন আহমেদ, ছফিরউদ্দিন, প্রফুল্লকুমার সরকার, যোগেন্দ্র চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ রয়েছেন।

সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাট বধ্যভূমি, কিশোরগঞ্জ
সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাট বধ্যভূমি, কিশোরগঞ্জ।

আলগড়ার মাঠ বধ্যভূমি

ভৈরবের ইব্রাহিমপুরের আলগড়ার মাঠে ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল ২৫০ জন লোককে হত্যা করা হয়।

ভৈরব ব্রিজ বধ্যভূমি

ভৈরব ব্রিজের কাছে রেললাইনের ওপর দাঁড় করে ২৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। শহীদদের মধ্যে ছিলেন মতিউর রহমান, মসলন্দ আলী, হাফিজ উদ্দিন মিয়া, শ্রীমোহন বাঁশি প্রমুখ।

টাঙ্গাইল জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

পানির ট্যাংক মাঠসংলগ্ন বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে অবস্থান নিয়ে শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় টাঙ্গাইল ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে আনা হতো এই সার্কিট হাউসে। সেখানে নির্যাতন চালানোর পর সার্কিট হাউসের পেছনে জেলা সদর পানির ট্যাংকের পাশে নির্জন স্থানে নিয়ে তাদের হত্যা করা হতো। একাত্তর সালের ৩ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী টাঙ্গাইল শহরে প্রবেশ করে। তারা টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে সামরিক দফতর স্থাপন করে। আর সার্কিট হাউসের পাশেই অবস্থিত সরকারি আবাসিক ভবনগুলো করা হয় বন্দিশালা ও নির্যাতনকেন্দ্র।

পানির ট্যাংক মাঠসংলগ্ন বধ্যভূমি, টাঙ্গাইল
পানির ট্যাংক মাঠসংলগ্ন বধ্যভূমি, টাঙ্গাইল।

মির্জাপুর বাজার বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মির্জাপুর বাজারে আক্রমণ চালিয়ে প্রায় ৫০ জন বাঙালিকে হত্যা করে।

বংশাই নদের তীর বধ্যভূমি

বংশাই নদীর তীরের বধ্যভূমিতে অসংখ্য মুক্তিগামী মানুষকে হত্যা করা হয়। শত্রু বাহিনী মানুষদের ধরে নিয়ে ব্রাশ ফায়ার ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে, তারপর নদীতে ফেলে দিত।

ছাব্বিশার গণহত্যা

ভূঞাপুর সদর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ছাবিবশা গ্রাম। বর্তমানে এটিভূঞাপুর পৌরসভার অধীনে। গ্রামটি মুক্তিযুদ্ধের সময় গোবিন্দাসী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭১ খ্রিস্টব্দে ছাবিবশা গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি বাহিনীরা গ্রামটিতে গণহত্যা চালায়। ১৭ নভেম্বর, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ছাবিবশা গ্রামের সেই নির্মম, বিভীষিকাময়, অবিস্মরণীয় দিন। সেদিন বেলা আনুমানিক এগারো ঘটিকায় সিরাজগঞ্জ থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যমুনা নদী পাড় হয়ে গাবসারার কালিপুর, সেখান থেকে গোবিন্দাসী আসে। এরপর শালদাইর দিয়ে এগিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল। অবস্থান নেয় ছাবিবশার পশ্চিম পাশে শালদাইর ব্রিজের কাছে। পাকিস্তানি সেনাদের অপর একটি দল কালিপুর থেকে উত্তর-পূর্বদিকে এগিয়ে কালিগঞ্জ, জিগাতলা-বাগবাড়ি হয়ে খুপিবাড়ির খাল ধরে ছাবিবশার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থান নেয়। হানাদারদের এ অবস্থান ছিল অতর্কিত অথচ পরিকল্পিত। তারা ছাবিবশার পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছুলেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এসব মুক্তিযোদ্ধা গাবসারা কালিগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। কালিপুর ঘাটে জাহাজ থেকে হানাদারদের নেমে আসার সংবাদ পেয়ে কালিগঞ্জে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা পূর্ব দিকে সরে বাধা দেওয়ার সুবিধাজনক স্থান হিসেবে ছাবিবশাতে এসে অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধা ও হানাদার বাহিনীর মধ্যে চলে প্রচন্ড গুলি বিনিময়। বিকেল প্রায় চারটা পর্যন্ত উভয় পক্ষে গুলিবর্ষণ চলে। এক পর্যায়ে হানাদারদের প্রচন্ড আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা টিকতে না পেরে সরে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা সরে গেলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা ছাবিবশা গ্রামে র্নিমম গণহত্যা চালায়। ১৯৭১ খ্রিস্টব্দের ১৭ নভেম্বর ছাবিবশার গ্রামের যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন তাদের নামঃ

  • ১. বিশা মন্ডল পিতা-ইসমাইল মন্ডল
  • ২. মনির উদ্দিন পিতা- ইয়াসীন আলী
  • ৩. ওমর আলী পিতা- পান্ড সরকার
  • ৪. সাজেদা বেগম স্বামী-ওমর আলী
  • ৫. রাবেয়া খাতুন পিতা- ওমর আলী
  • ৬. খালেদা খাতুন নানা- ওমর আলী
  • ৭. ইসমাইল হোসেন পিতা- কিতাবুল্লাহ
  • ৮. মমতাজ উদ্দিন পিতা- কিতাবুল্লাহ
  • ৯. শমসের আলী পিতা- আহসান আলী
  • ১০.মছিরন নেছা স্বামী- ময়েজ শেখ
  • ১১. আয়নাল হক (আব্দুল জুববার মুন্সীর দিনমজুর)
  • ১২. হাফেজ উদ্দিন পিতা- গোল হোসেন
  • ১৩. দানেছ আলী পিতা- বছির উদ্দিন সরকার
  • ১৪. তাছেন আলী পিতা- বছির উদ্দিন সরকার
  • ১৫. হায়দার আলী পিতা- দানেছ আলী
  • ১৬. সেকান্দার আলী পিতা- নতিবুল্লাহ
  • ১৭. রমজান আলী পিতা- সেকান্দার আলী
  • ১৮. কোরবান আলী পিতা- আয়েতুল্লাহ (গাবসারা বিশ্বনাথপুর)
  • ১৯. মাহমুদ আলী পিতা- ময়েজ শেখ
  • ২০. আবুল হোসেন (সিরাজ আলী দিনমজুর,গ্রাম-রুহুলী)
  • ২১. ইউসুফ আলী পিতা- আব্দুল জুববার মুন্সী
  • ২২. শফিকুল ইসলাম পিতা- আব্দুল জুববার মুন্সী
  • ২৩. মোতালেব হোসেন পিতা- আব্দুল জুববার মুন্সী
  • ২৪. ইয়াকুব আলী পিতা- মাজম আলী
  • ২৫. শুকুর মাহমুদ মন্ডল পিতা- আব্দুস সোবাহান মন্ডল
  • ২৬. বাহাজ উদ্দিন মন্ডল পিতা- গোমর মন্ডল
  • ২৭. আব্দুল গফুর পিতা- হাজী হোসেন আলী
  • ২৮. রাবেয়া খাতুন স্বামী-আব্দুল শেখ
  • ২৯. জহির উদ্দিন পিতা- জসিম উদ্দিন
  • ৩০. সোনা উল্লাহ পিতা-সায়েদ আলী
  • ৩১. সিরাজ আলী পিতা- ময়েজ সেখ
  • ৩২. হোসনা খাতুন (ওমর আলীর আত্মীয়)

নাগরপুরের বনগ্রাম গণকবর

১৯৭১ সালের ২১ শে অক্টোবর বনগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিয়েছেন এমন সংবাদ পেয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে গানবোট নিয়ে এসে পাক হানাদার বাহিনী বনগ্রাম আক্রমন করে। সে সময় তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ১ জন মেজর সহ ৩ জন নিহত হয়। আর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে শহীদ হন জেলার কালিহাতী উপজেলার নজরুল ইসলাম নজু, মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার জাহাঙ্গীর আলম, আকতারুজ্জামান ও ওহাব আলী সহ ৭জন। অবস্থা বেগতিক দেখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে ও পাক হানাদার বাহিনী স্ব স্ব ক্যাম্পে ফিরে যায়। পরবর্তীতে পাক হানাদার বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে ২৫ শে অক্টোবর বনগ্রাম আক্রমন করে অগ্নি সংযোগ ও ব্যাপক গণহত্যা চালায়। আবাল, বৃদ্ধ, শিশু ও মহিলা কেউ রেহাই পায়নি হায়েনাদের হাত থেকে, হত্যা করে ৫৭ জনকে এবং ১২৯ টি বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে। পরে তাদেরকে একত্রে মাটি চাপা দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পরে ঐ স্থানটি বনগ্রাম গণকবর হিসেবে নাম করন করা হয়।

নাগরপুরের বনগ্রাম গণকবর, টাঙ্গাইল
নাগরপুরের বনগ্রাম গণকবর, টাঙ্গাইল।

গোড়ান ও সাটিয়াচড়া গণহত্যা

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী গোড়ান, সাটিয়াচড়া গ্রামে এক নারকীয় গণহত্যা চালায়। এতে ইপিআরের ২৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৪০০ জন শহীদ হন।

শেরপুর জেলার বধ্যভূমি ও গণকবর

মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ
মানচিত্রে জেলার বধ্যভুমিসমূহ।

জগৎপুর গণহত্যা

সেদিন ছিল বাংলা ১৬ বৈশাখ, ৩০ এপ্রিল শুক্রবার। সকাল ৮টার দিকে জগৎপুরের সামনের শংকরঘোষ গ্রাম থেকে স্থানীয় রাজাকার মজিবর, বেলায়েত, নজর ও কালামের সহযোগিতায় পাকবাহিনী জগৎপুরের ৩ দিক থেকে ঘিরে ফেলে। পাক বাহিনীর ৩টি দল গ্রামের ৩ দিকে গিয়ে অবস্থান নিয়ে নির্বিচারে গুলি করতে থাকে। ওইসময় গ্রামবাসী কোন কিছু না বুঝেই জীবন বাঁচাতে গ্রামের পেছনের দিকের রাঙ্গুনিয়া বিলের দিকে দৌড়ে পালাতে থাকে। কিন্তু বিলের মাঝখানে পানি থাকায় কেউ সাঁতরিয়ে, আবার কেউ বিলের দু’পাড় ঘেঁষে পালাতে যায়। ওই সময় শুকনো জায়গা দিয়ে পালাতে গিয়ে পাক সেনাদের গুলিতে শহীদ হন ৪২ জন গ্রামবাসী। শুধু গুলি করে গ্রামবাসীকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি পাক সেনারা। তারা জনমানুষ শূন্য গ্রামের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়। ঘটনার প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘন্টা পর পাক সেনারা চলে গেলে কিছু কিছু গ্রামবাসী ফিরে এসে দেখে তাদের বাড়ি-ঘরের স্থলে পোড়া গন্ধ ও ছাঁই ছাড়া আর কিছুই নেই। ওই অবস্থা দেখে অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায়। আবার অনেকেই নাড়ীর টানে পড়ে থাকে গ্রামেই। এদিকে হিন্দু-মুসলিম অনেকেই তাদের আত্মীয়দের লাশ গ্রামের একটি জঙ্গলের কাছে গণকবর দেয়। ওই গণকবরের পাশেই বর্তমানে হিন্দুদের শ্মশান ঘাট রয়েছে। কিন্তু ওই গণকবরের স্থানে আজও স্মৃতিফলক না করায় ক্ষোভ রয়েছে গ্রামবাসীর।

জগৎপুর গণকবর, শেরপুর
জগৎপুর গণকবর, শেরপুর ।

নাকুগাও ডালু গণহত্যা

১৯৭১ সালের ২৫ মে নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও সীমান্তের ভোগাই নদী পার হয়ে পাকহানাদার বাহিনী ভারতের বারাঙ্গাপাড়া থানার ডালুতে গণহত্যা চালায়। এ সময় বাংলাদেশ থেকে ডালুতে আশ্রয় নেয়া মুক্তিকামী মানুষ ও ভারতীয় নাগরিকসহ দুই শতাধিক নারী-পুরুষ নিহত হয়। শহীদদের মধ্যে নুর ইসলাম (ইপিআর), নুরুজ্জামান (পুলিশ), রিয়াজ সরকার প্রমুখ রয়েছেন। পাক হানাদারদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে ৯জন বিএসএফ সদস্য। ভারতের কাটাতার ঘেঁষা এই নাকুগাঁওয়ে গণহত্যার শিকার বাংলাদেশি মুসলমানদের লাশ দাফন করা হয়। এছাড়াও ৯ মাসে এ স্থানে বিভিন্ন যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেয়া হয়।

সোহাগপুর গণহত্যা

বৃহত্তর ময়মনসিংহের তৎকালীন আলবদর কমান্ডার জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের প্রত্যক্ষ মদদে ও স্থানীয় রাজাকার কাদের ডাক্তারের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী সোহাগপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় ১৫০ জনের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় প্রফুল্লের দিঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত এলাকা ঘিরে ফেলে। একে একে হত্যা করে প্রায় ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে। একইসাথে হায়েনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন ১৩ জন নারী।

সোহাগপুর স্মৃতিসৌধ, শেরপুর
সোহাগপুর স্মৃতিসৌধ, শেরপুর।

একাত্তরে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে ১৪৪ জনকে হত্যা ও নারী নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পরে ১১ই এপ্রিল ২০১৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাত ১০টা ৩১ মিনিটে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সূর্যদীর গণহত্যা

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর সূর্যদী গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী এক নারীসহ ৪৭ জনকে হত্যা করে। শহীদদের মধ্যে আক্তারুজ্জামান, আফছার উদ্দিন, আইজউদ্দিন প্রমুখ রয়েছেন। পাশাপাশি হাজারো ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অনেক নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

তথ্যসূত্র:

**এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, একই বধ্যভূমিতে প্রাপ্ত মৃতদেহ বা হত্যার শিকার ব্যক্তির সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন হলে আলোচনার খাতিরে ও কুতর্ক রোধে যেই সংখ্যাটি সর্বনিম্ন সেটি নেয়া হয়েছে।

		উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, 
			‘ ভয় নাই, ওরে ভয় নাই —
		নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
			ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। '
						-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উপসংহার: ক্রন্দন, ক্রোধ ও স্মৃতির ভার

১৯৭১ সালের গণহত্যা ও বধ্যভূমি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমোঘ দাগ রেখেছে। নিরীহ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, নারী ও শিশুদের হত্যা শুধুমাত্র অতীতের ব্যথা নয়, ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণাও; এত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার স্পৃহার যোগানদাতা। বধ্যভূমিসমূহ, এত গণকবর, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং স্মৃতিস্তম্ভ এরা প্রত্যেকে আমাদের শেখায় স্বাধীনতার মূল্য ও মানবতার গুরুত্ব।

এই স্মৃতি ভু্লবার নয়, বরং আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে দেশপ্রেমের শিক্ষার আলোক উৎস। একথা অনস্বীকার্য যে, ইতিহাসকে স্মরণ করা মানে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।

যুক্ত হোন ডিজিটাল জগতে!

SSL Labs Verified Mozilla Security Verified Safe Browsing Verified Valid HTML Verified Fast PageSpeed Verified