করতোয়া নদীর তীর ধরে হাঁটলে, ঘাসের উপর জমা শিশিরের শব্দহীন ফোঁটাগুলো হঠাৎ পায়ের ধুলার সঙ্গী হয়ে ওঠে। চারদিকে গ্রামের নিস্তব্ধতা, মাঝেমধ্যে পাখির ডাক, আর দূরে ভেসে আসে এক বিস্মৃত শহরের নিঃশ্বাস। এই যে নদীর বাঁক ঘুরতেই দেখা যায় ইটগাঁথা উঁচু ঢিবি—এটাই মহাস্থানগড়, বাংলার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীনতম নগর।
ইতিহাস এখানে শুধু পাথরের ভঙ্গুর অক্ষরে লেখা নয়—এখানে ইতিহাস বাতাসে ভাসে, জলের মতো বয়, মাটির গায়ে ঘুমিয়ে থাকে। যেন প্রতিটি ইট ফিসফিস করে কিছু বলতে চায়, প্রতিটি দরজা খুলে দিতে চায় সহস্রাব্দের মহাকাব্য।
ভূমিকা — ইতিহাসের দর্পণে এক আলো-আঁধারির নগর
বাংলাদেশ যখনো নামলেখা হয়নি পৃথিবীর মানচিত্রে, তখন পদ্মা–বংশী–করতোয়ার মিলিত গর্ভে জন্ম নিয়েছিল একটি শহর—এক প্রাচীন সভ্যতার প্রথম স্থপতি, প্রথম প্রশাসন, প্রথম নগরায়ণ। সেই শহরের নাম
পুণ্ড্রনগর। আজ আমরা তাকে বলি মহাস্থানগড়।
পাহাড়পুর বিহার, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
উঁচু টিলার ওপর বিস্তৃত এই নগরটি শুধু ইট-পাথর, দুর্গ-প্রাচীর বা কাদামাটির ফসল নয়—এটি হাজার বছরের হাহাকার, বাণিজ্য, যুদ্ধ, সভ্যতা, ধর্মীয় পরিবর্তন এবং সাহিত্যের জন্মস্থান।
বাংলার ইতিহাসে এত প্রাচীন, এত বিস্তৃত, এত রাজনৈতিক-মাহাত্ম্যপূর্ণ নগর আর নেই।
মহাস্থানগড়ের নামকরণ — ‘মহা–স্থান’ থেকে ‘গড়’
“মহাস্থান” শব্দটি এসেছে পালি বা সংস্কৃত “মহাস্থান” অর্থাৎ ‘মহৎ স্থান’, ‘বৃহৎ জনপদ’ বা ‘পবিত্র ভূমি’ থেকে।
আর ‘গড়’ মানে দুর্গ। অর্থাৎ
মহাস্থানগড় = মহৎ স্থানের দুর্গনগর।
মহাস্থানগড়, বগুড়া।
তবে আরেকটি মত বলছে—গুপ্ত-পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; তাই ‘মহাস্থান’ নামকরণ।
প্রাচীন পুণ্ড্রনগর — বাংলার প্রথম রাজধানী
মহাস্থানগড়ের ইতিহাস কমপক্ষে ২৫০০ বছরের পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে এখানে স্থাপিত হয়
মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক রাজধানী। পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন ছিল উত্তর বঙ্গের বৃহৎ আর্য-অনার্য জনপদ।
মৌর্য যুগ (খ্রি.পূ. ৪র্থ শতাব্দী–২য় শতাব্দী)
অশোকের সময়কালে এখানে ‘ধর্ম মহামাত্র’ নিয়োগের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবিষ্কৃত ‘মহাস্থান প্রাক-শিলালিপি’তে দেখা যায় করতোয়া নদীতে
ভেসে যাওয়া এক দুর্ভিক্ষ-আক্রান্ত অঞ্চলে চাল সরবরাহের আদেশ।
গুপ্ত যুগ (৪র্থ–৬ষ্ঠ শতাব্দী)
গুপ্ত নৃপতিদের অধীনে পুণ্ড্রনগর ছিল বাণিজ্য ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নগরীর দক্ষিণে পাওয়া মুদ্রা, সীলমোহর, ভগ্নবিহার
এই সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়।
পাহাড়পুর বিহার, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
পাল সাম্রাজ্য (৮ম–১২শ শতাব্দী)
এই সময়ে বৌদ্ধ ধর্মচর্চা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। তৎকালীন পুণ্ড্রনগরজুড়ে ছড়ায় বিহার, স্তূপ, ভিক্ষুক-আশ্রম ও শিক্ষা কেন্দ্র।
‘'গোবিন্দ ভিটা', 'বাইরগাইর ভিটা', 'খদ্দল রাজার বাড়ি'—সবই পাল যুগের প্রত্নচিহ্ন।
সেন রাজবংশ (১১শ–১৩শ শতাব্দী)
বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমে এসে শক্তিশালী হয় ব্রাহ্মণ্যবাদ। লক্ষ্মণ সেনের সময় পুণ্ড্রনগরের দুর্গ পুনর্গঠিত হয়।
সেনতর মহাকাব্য, দেবীমহাত্ম্য, পুরাণকথা এখানে লিপিবদ্ধ হওয়া শুরু হয়।
মহাস্থানগড়, বগুড়া।
⛏️ মহাস্থানগড়ের খনন ইতিহাস
মহাস্থানগড়ের পুরাতত্ত্ব অনুসন্ধান এবং বৈজ্ঞানিক খনন শুরু হয় ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগে, যখন
ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রথম উপলব্ধি করেন যে করতোয়া নদীর তীরের এই বিশাল উঁচু ভূমিটি কেবল
একটি গ্রাম্য টিলাই নয়—এটি বাংলার হারানো এক নগর–সভ্যতার স্মৃতিস্তম্ভ। পরবর্তীকালে
দেশি-বিদেশি প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারাবাহিক গবেষণা আজ মহাস্থানগড়কে পরিণত করেছে এক
সুবৃহৎ প্রত্ন–মানচিত্রে।
🔹 ১৮৭৯: স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের প্রাথমিক জরিপ
ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম মহাস্থানগড়কে
পৌণ্ড্রবর্ধন নগর হিসেবে শনাক্ত করেন। তাঁর জরিপে প্রাপ্ত ইটের দেয়াল, প্রত্ন–উপকরণ
ও অঞ্চলের জনশ্রুতি পৌণ্ড্রবর্ধনের ঐতিহাসিক পরিচয়কে দৃঢ় করে।
গত শতাব্দীতে চলা খনন কাজ, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
🔹 ১৯২৮–২৯: ড. গ্রেসোন ও ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অনুসন্ধান
১৯২৮–২৯ সালে প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে খনন শুরু করে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (ASI)।
তারা উত্তর-দক্ষিণ সীমানা প্রাচীর, বাটি–বসতি স্তর, মাটির তৈরি নল–নিকাশি এবং
নগরের প্রাচীন রাস্তার অংশ শনাক্ত করে। এ পর্যায়ের খননে নগরটির আয়তন ও প্রকৃতি প্রথম স্পষ্ট হয়।
🔹 ১৯৬১–৬৪: পাকিস্তান প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বড় মাপের খনন
১৯৬০-এর দশকে খননের পরিধি বাড়ানো হয়। আবিষ্কৃত হয়:
প্রাচীন দুর্গ–প্রাচীরের বিশাল অংশ
টেরাকোটা ফলক
মৌর্য–গুপ্ত যুগের মৃৎপাত্র
ধর্মীয় স্থাপনার ভগ্নাবশেষ
এই সময়ের খনন মহাস্থানগড়কে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন নগরচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
গোকুল মেধ, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
🔹 ১৯৯৩–২০০৪: বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ খনন
বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ফ্রান্সের প্রত্নতাত্ত্বিক দল যৌথভাবে প্রায় ১০ বছর খনন চালায়।
এ পর্যায়ে আবিষ্কৃত হয়:
মহাস্থানগড়ের কেন্দ্রীয় রাজকীয় অঞ্চল
মুদ্রা, শিলালিপি ও রাজস্ব সম্পর্কিত নিদর্শন
দ্বি–কম্পার্টমেন্টযুক্ত ঘর, দীর্ঘ সরু সড়ক
গোকুল মেধ, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়—এটি ছিল উৎকৃষ্ট নগর–পরিকল্পনার এক সুপ্রাচীন উদাহরণ।
🔹 ২০১০–বর্তমান: আধুনিক অনুসন্ধান ও থ্রিডি ম্যাপিং
আধুনিক গ্রাউন্ড–পেনিট্রেটিং রাডার (GPR), ড্রোন সার্ভে এবং মাটি–স্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে
বর্তমানে মহাস্থানগড়ের আরও অজানা কাঠামোর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। নগর–পরিধির বাইরে পাওয়া
আবাসস্থল ও রাস্তার নেটওয়ার্ক ইঙ্গিত দেয়—মহাস্থানগড় ছিল এক বিশাল উপ–নগরসমূহের
সম্মিলিত কেন্দ্র।
গোকুল মেধ, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
সার্বিকভাবে, মহাস্থানগড়ের খনন ইতিহাস কেবল একটি প্রত্নস্থল খোঁড়ার গল্প নয়;
এটি সময়ের স্তরে স্তরে চাপা পড়ে থাকা বাংলার সভ্যতার মহানগরকে পুনরাবিষ্কারের
এক দীর্ঘ গবেষণা–অভিযান।
সময়
ঘটনা
গুরুত্ব
১৮০৮
হ্যামিল্টনের পর্যবেক্ষণ
প্রথম আধুনিক নথিভুক্ত উল্লেখ
১৯২৮–৩১
ব্রিটিশ প্রত্নখনন
মৌর্য-গুপ্ত-পাল স্তর উদ্ঘাটন
১৯৬০–৭০
পাকিস্তান অধ্যায়ের খনন
বৌদ্ধ বিহার ও শহর কাঠামো
১৯৮৯–২০০৪
আন্তর্জাতিক মিশনের খনন
শহরের প্রাচীনতম স্তর শনাক্ত
২০০৪–বর্তমান
প্রযুক্তিভিত্তিক খনন
3D মানচিত্রায়ন ও সংরক্ষণ
দুর্গনগরীর মানচিত্র — প্রাচ্য নগর পরিকল্পনার অমূল্য দলিল
আজকের মহাস্থানগড় প্রায় ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর চারদিকে প্রাচীন দুর্গ প্রাচীর,
জলাশয়, মন্দির, বিহার, দেবালয় এবং ‘কজলা গেট’ বা আস্তানা পথের মতো প্রবেশপথ ছিল।
গোকুল মেধ: দেখতে যেন ইটের তৈরি বিশাল পিরামিড, মনসা কাহিনির সঙ্গে যার সম্পর্ক অটুট।।
গোকুল মেধ, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
ভাসু বিহার: ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শহর যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়—শান্তির আলো এখনো নীরবে জ্বলছে।
ভাসু বিহার, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
ভগবানপুর প্রাচীর: ছায়াপথের মতো সারি সারি প্রাচীন ইটের দেয়াল।
ভগবানপুর প্রাচীর, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ারের দরগাহ: মধ্যযুগে ইসলাম প্রচারের অন্যতম কেন্দ্র।
শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ারের দরগাহ, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
মধ্যযুগ ও মহাস্থানগড়ের পতন
১৩শ শতাব্দীর পর তুর্কি-আফগান অভিযানের ফলে রাজশক্তির কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় পদ্মা–যমুনা উপত্যকার দিকে।
বন্যা, নদীভাঙন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনে পুণ্ড্রনগরের জৌলুস কমতে থাকে।
পাহাড়পুর বিহার এর বর্ণনা
পরে একজন সুফি সাধক—শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার—এ অঞ্চলকে আধ্যাত্মিক কেন্দ্র করে তোলেন।
তাঁর মাজার মহাস্থানের এক বৃহৎ ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্র।
প্রত্নতত্ত্ব—যে মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে হারানো সভ্যতা
ভ্রমণসঙ্গীদের সাথে লেখক, মহাস্থানগড়, বগুড়া।
১৮০৮ সালে বুকেন্যান হ্যামিল্টনের ভ্রমণ বিবরণে প্রথম মহাস্থানগড়ের বিশদ উল্লেখ পাওয়া যায়।
এরপর ১৯২৮ সালে কর্নেল কডিংহ্যামের নেতৃত্বে প্রত্নখনন শুরু হয়।
পাল, সেন, গুপ্ত, মৌর্য—একাধিক স্তরের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ বেরিয়ে আসে।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও ইউনেস্কোর বিশেষ তত্ত্বাবধানে মহাস্থানগড়কে
বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার সম্ভাব্য মনোনয়ন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর — মহাস্থানগড়ের লোকগাঁথা
শিবকন্যা দেবী মনসা সর্প দেবী হওয়ায় পূজিত ছিলেন না। দেবতারাও তার পুজার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাই তিনি নিজের পিতার কাছে নিজের পূজা প্রচলনের দাবি করেন। দাবীর জবাবে শিব বলেন, ‘যদি আমার একনিষ্ঠ ভক্ত ও পূজারী চাঁদ সওদাগর তোমার পূজা দিতে রাজি হয় তবে দুনিয়ায় তোমার নামে পূজার প্রচলণ হবে।’ কিন্তু শিব ভক্ত চাঁদ সওদাগর এক তুচ্ছ নারীকে পূজা দিতে রাজি তো হয়-ই না, উল্টো লাঠি নিয়ে মনসাকে তাড়া করে। যে কারণে মনসা চাঁদের চম্পক নগরে সাপের উপদ্রব বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে সর্পদংশনে একে একে চাঁদের ছয় সন্তানের মৃত্যু হয়। বাণিজ্যে লাভ করে প্রচুর পরিমাণ ধনসম্পদবোঝাই জাহাজ নিয়ে চাঁদ ফিরছিলেন তার চম্পক নগরে। প্রচণ্ড রোষের বসবর্তী হয়ে মনসা এক ঝড় উৎপন্ন করে জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। প্রাণে বেঁচে চাঁদ এক দ্বীপে আশ্রয় নেয়, তবুও সে মনসার পূজা দিতে রাজি হয় না।
চম্পক নগরে ফিরে চাঁদ নতুন করে জীবন শুরু করে। জন্ম হয় এক পুত্র সন্তানের, তার নাম রাখা হয় লক্ষ্মীন্দর। চাঁদ যদি মনসার পূজা না দেয় তবে লক্ষ্মীন্দর বাসরঘরে সাপের দংশনে মারা যাবে। কথাটি জেনেও সে তার পুত্রের বিয়ে ঠিক করে ব্যবসায়িক মিত্র সাহার কন্যা বেহুলার সঙ্গে। সাপ যাতে দংশন করতে না পারে সেজন্য চাঁদ সওদাগর বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের জন্য দেবতা বিশ্বকর্মাকে দিয়ে তৈরি করায় একটি লোহার বাসরঘর। মনসা দেবীর চাপে তিনি লৌহপ্রাচীরে ছোট একটি ছিদ্র রেখে দেন। সেই সুতার ন্যায় ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে কালনাগ লক্ষ্মীন্দরকে দংশন করে হত্যা করে।
বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসর ঘর বা লক্ষ্মীন্দরের মেধ
প্রচলিত প্রথা মোতাবেক সর্প দংশনে মৃত ব্যক্তির সৎকার না করে ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত। ধারণা করা হত মৃত ব্যক্তিটি কোনো অলৌকিক শক্তিবলে পুনরায় ফিরে আসবে। সে বিশ্বাস থেকে লক্ষ্মীন্দরের মৃত দেহও ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বেহুলা নিজেও সে ভেলায় স্বামীর সঙ্গী হয়। ছয়মাস ধরে ভাসতে থাকে নানা ঘাটে ঘাটে। এক পর্যায়ে বেহুলা জ্ঞাত হন যে, স্বর্গের দেবতাদের তুষ্ট করতে পারলে এর একটা বিহিত হতে পারে। অবশেষে বেহুলা দেবপুরীতে পৌঁছে এবং দেবতাদের সামনে নৃত্যকলা প্রদর্শন ও গান গেয়ে তাঁদের তুষ্ট করতে সমর্থ হয়।
দেবতাদের অনুরোধে মনসা রাজি হলেন লক্ষ্মীন্দরকে আবার জীবন দানে। কিন্তু সাথে শর্ত দিলেন। শর্ত হিসেবে মনসা বললেন, "তুমি লক্ষ্মীন্দরকে ফিরে পাবে, যদি তুমি তোমার শ্বশুড়কে আমার পূজারী করতে পারো।" বেহুলা তাঁর শাশুড়িকে সব ঘটনা বর্ণনা করলেন। বেহুলা তার শ্বাশুড়ির সহযোগীতায় চাঁদ সওদাগরকে মনসার উপাসনা করতে সম্মত হন। চাঁদের পক্ষে আর না বলা সম্ভব হয় না। কিন্তু মনসা তাঁকে যে কষ্ট দিয়েছিলেন, তা তিনি সম্পূর্ণ ক্ষমা করতে পারেননি। তিনি বাম হাতে প্রতিমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে মনসাকে পূজা করেন। মনসা তাতেই সন্তুষ্ট হন। তারপর মনসা অলৌকিক ক্ষমতাবলে লক্ষ্মীন্দর ক্ষয়ে যাওয়া মাংস ফিরে আসে এবং তাঁর চোখ মেলে তাকায়। এরপর লক্ষ্মীন্দর বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসে। ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে চোখের পলকে বেহুলা ও মৃত লক্ষ্মীন্দরকে স্বর্গে পৌছে দেন। চাঁদের ছয় পুত্রকেও মনসা জীবন দান করেন। চাঁদ সদাগরের ডুবে যাওয়া চৌদ্দ ডিঙ্গাও অক্ষত ভাবে ফিরিয়ে দেন। চাঁদ সদাগর ও তাঁর পরিবার সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকে।
এর পর মনসার পূজা বৃহত্তর জনসমাজে প্রচার লাভ করে। বিশেষ করে সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং সন্তান কামনায় মনসার পূজা করা হয়।
উপসংহার — মহাস্থানগড় আমাদের সভ্যতার নাভিকেন্দ্র
মহাস্থানগড় কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়—এটি বাঙালির সভ্যতার জন্মের সাক্ষ্য, প্রথম নগরবাস, প্রথম প্রশাসন, প্রথম সাহিত্যসূত্রের স্মৃতি।
একজন বেহুলার কান্না যেমন এর নদীপাড়ে জেগে থাকে, তেমনি এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর ধ্যানের শব্দ এখনো মাটি থেকে ভেসে আসে।
ইতিহাসের আলেখ্যে মহাস্থানগড়ই আমাদের মূল—আমাদের অতীতের প্রথম ছাপা বই, প্রথম গল্পের শহর, প্রথম রাষ্ট্রের ভিত্তি।