🪐 মাল্টিভার্সের ধারণা কেন এলো?
মাল্টিভার্সের ধারণা কোনো একক আবিষ্কার থেকে আসেনি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কয়েকটি আলাদা প্রশ্ন ও তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে এটি উঠে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মহাবিশ্বের মৌলিক ধ্রুবকগুলোর মান, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যাখ্যা এবং মহাজাগতিক ইনফ্লেশন।
১. আমাদের মহাবিশ্বের নিয়ম এমন কেন?
প্রকৃতির কিছু মৌলিক ধ্রুবক ও কণার বৈশিষ্ট্য আমাদের মহাবিশ্বের গঠন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন মহাকর্ষের শক্তি, ইলেকট্রনের ভর, মৌলিক কণাগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া এবং মহাজাগতিক ধ্রুবকের মান। এগুলোর সম্মিলিত প্রভাবের কারণে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, রাসায়নিক মৌল এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এখানেই একটি প্রশ্ন আসে: প্রকৃতির ধ্রুবকগুলোর মান এমন কেন? এগুলো কি পদার্থবিজ্ঞানের আরও গভীর কোনো নিয়মের কারণে এমন হয়েছে, নাকি অন্য মানও সম্ভব ছিল?
এই প্রশ্নকে প্রায়ই ফাইন-টিউনিং সমস্যা (Fine-tuning Problem) বলা হয়। কিছু তাত্ত্বিক মডেলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট ধ্রুবকের মান অনেকটা বদলে গেলে নক্ষত্রের গঠন, জটিল রাসায়নিক কাঠামো বা দীর্ঘস্থায়ী জীবনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়া কঠিন হতে পারে। তবে সব ধ্রুবকের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য নয়, এবং কোন পরিবর্তনে ঠিক কী ঘটবে, তা নির্ভর করে অন্য ধ্রুবকগুলো অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে কি না তার ওপর।
মাল্টিভার্সের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, যদি বাস্তবেই অনেক মহাবিশ্ব থাকে এবং সেগুলোর ভৌত ধ্রুবকের মান ভিন্ন হয়, তাহলে অধিকাংশ মহাবিশ্বে জীবন সম্ভব না হলেও কিছু মহাবিশ্বে জীবন গড়ে ওঠার উপযোগী পরিস্থিতি থাকতে পারে। আমরা স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি মহাবিশ্বে নিজেদের দেখতে পাব, যেখানে আমাদের অস্তিত্ব সম্ভব। এই যুক্তির সঙ্গে অ্যানথ্রপিক প্রিন্সিপল (Anthropic Principle) সম্পর্কিত।
তবে এটি এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, ধ্রুবকগুলোর মানের পেছনে আরও মৌলিক কোনো ভৌত কারণ থাকতে পারে। আবার মাল্টিভার্স সত্য হলেও সব সম্ভাব্য মান সমানভাবে ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
২. কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রহস্য
অতি ক্ষুদ্র জগতের কণাগুলোকে বর্ণনা করতে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করা হয়। সেখানে একটি কণার অবস্থা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মতো সব সময় নির্দিষ্ট অবস্থান বা নির্দিষ্ট ফলাফল দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। একটি কোয়ান্টাম অবস্থা একাধিক সম্ভাব্য ফলাফলের সুপারপজিশন (Superposition) হিসেবে বর্ণিত হতে পারে।
ধরা যাক, একটি পরীক্ষায় একটি কণার স্পিন মাপা হবে। পরিমাপের আগে তার কোয়ান্টাম অবস্থা এমন হতে পারে, যেখানে সম্ভাব্য ফলাফলগুলো একসঙ্গে গাণিতিকভাবে উপস্থিত থাকে। কিন্তু যন্ত্রে পরিমাপ করলে আমরা একটি নির্দিষ্ট ফলাফল পাই। এই প্রশ্নটি—কোয়ান্টাম অবস্থা থেকে আমাদের দেখা নির্দিষ্ট ফলাফল কীভাবে আসে—কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার অংশ।
১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানী হিউ এভারেট তৃতীয় (Hugh Everett III) কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেন, যা পরে মেনি-ওয়ার্ল্ডস ইন্টারপ্রিটেশন (Many-Worlds Interpretation বা MWI) নামে পরিচিত হয়।
এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোয়ান্টাম পরিমাপের সময় পুরো তরঙ্গ-ফাংশন ধসে গিয়ে একটি ফলাফল বেছে নেয়—এমনটি ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কোয়ান্টাম অবস্থার বিভিন্ন ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত শাখাগুলোকে বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি শাখায় পর্যবেক্ষক একটি নির্দিষ্ট ফলাফল দেখতে পান।
জনপ্রিয় ভাষায় একে প্রায়ই বলা হয়, প্রতিটি সিদ্ধান্তের পর মহাবিশ্ব ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু এটি মূল তত্ত্বের একটি অতিসরলীকৃত বর্ণনা। মেনি-ওয়ার্ল্ডস ব্যাখ্যায় মানুষের প্রতিটি দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা মহাবিশ্ব তৈরি হয়—এমন কোনো স্বতন্ত্র নিয়ম নেই। এখানে মূল বিষয় হলো কোয়ান্টাম অবস্থার বিবর্তন এবং বিভিন্ন ফলাফলের শাখার মধ্যে কার্যকর বিচ্ছিন্নতা।
এই শাখাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম ডিকোহেরেন্স (Quantum Decoherence) গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশের সঙ্গে একটি কোয়ান্টাম ব্যবস্থার মিথস্ক্রিয়ায় বিভিন্ন সম্ভাব্য অবস্থার মধ্যে পর্যবেক্ষণযোগ্য হস্তক্ষেপ কার্যত হারিয়ে যেতে পারে। এতে আমাদের পরিচিত ধ্রুপদি জগতের মতো নির্দিষ্ট ফলাফল দেখা দেওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য মেলে। তবে ডিকোহেরেন্স একাই কোয়ান্টাম পরিমাপের সব ব্যাখ্যাগত প্রশ্ন মিটিয়ে দেয় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মেনি-ওয়ার্ল্ডস কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি ব্যাখ্যা; এটি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত অন্য মহাবিশ্বগুলোর আবিষ্কার নয়। কোয়ান্টাম তত্ত্বের অন্য ব্যাখ্যাও রয়েছে, এবং কোন ব্যাখ্যাটি বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
৩. কসমিক ইনফ্লেশন: মহাবিশ্বের অতি দ্রুত প্রসারণ
মহাবিশ্বের প্রাথমিক ইতিহাস ব্যাখ্যা করার জন্য কসমিক ইনফ্লেশন (Cosmic Inflation) নামে একটি ধারণা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মতে, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে স্থান খুব দ্রুত প্রসারিত হয়েছিল। এই ধারণা মহাবিশ্বের বৃহৎ পরিসরের প্রায় সমতল জ্যামিতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
ইনফ্লেশন মহাজাগতিক মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর সুনির্দিষ্ট ভৌত প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। সব ইনফ্লেশন মডেলও এক রকম নয়। বিশেষ করে ইনফ্লেশন আদৌ ঘটেছিল কি না, সেটি নিশ্চিত করার জন্য আদিম মহাবিশ্বের আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ প্রয়োজন।
কিছু ইনফ্লেশন মডেলে একটি বিশেষ সম্ভাবনা দেখা যায়, যার নাম ইটার্নাল ইনফ্লেশন (Eternal Inflation)। এই ধারণায় মহাবিশ্বের কিছু অঞ্চলে ইনফ্লেশন শেষ হয়ে স্বাভাবিক প্রসারণের পর্যায় শুরু হতে পারে, অথচ অন্য অঞ্চলে ইনফ্লেশন চলতে থাকে। ফলে স্থানভেদে বহু বিচ্ছিন্ন অঞ্চল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এমন একটি মডেলে প্রতিটি অঞ্চলকে জনপ্রিয় ভাষায় একটি বুদ্বুদ মহাবিশ্ব (Bubble Universe) হিসেবে কল্পনা করা যায়। আমাদের মহাবিশ্ব হতে পারে এমন একটি অঞ্চলের উদাহরণ। অন্য বুদ্বুদগুলোতে ভৌত অবস্থার পার্থক্য থাকতে পারে, যদিও তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট মডেলের ওপর।
তবে এখানে সতর্ক থাকা দরকার: ইনফ্লেশন এবং ইটার্নাল ইনফ্লেশন এক বিষয় নয়। ইনফ্লেশন ঘটলেও তার মানে এই নয় যে অনিবার্যভাবে অসংখ্য মহাবিশ্ব রয়েছে। মাল্টিভার্সের সম্ভাবনা আসে ইনফ্লেশনের কিছু নির্দিষ্ট মডেল থেকে, পুরো ধারণা থেকে সরাসরি নয়।