গোল্ডেন রেকর্ড (Golden Record)
- উদ্দেশ্য ছিল সৌরজগতের বাইরের বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রাণের কাছে একটি সাংস্কৃতিক সময়ক্যাপসুল পৌঁছানো।
- বাংলা ভাষাতেও একটি শুভেচ্ছা অন্তর্ভুক্ত ছিল: “নমস্কার! বিশ্বে শান্তি হোক”
- মোট ৫৫টি ভাষায় কথোপকথন ও শুভেচ্ছা রেকর্ড করা হয়।
মহাজাগতিক ভীনগ্রহবাসীদের জন্য নির্দেশাবলীসহ গোল্ডেন রেকর্ড-এর বহিরাবরণ
ভয়েজার ১ মহাকাশযানের গোল্ডেন রেকর্ডের আবরণ: মহাজগতিক সত্ত্বা-দের জন্য বার্তা
নাসার ভয়েজার মহাকাশযানের গোল্ডেন রেকর্ডের আবরণ চিত্র মূলত একটি “মহাজাগতিক বাসিন্দাদের জন্য বার্তা”—যেখানে রেকর্ডটি কীভাবে বাজাতে হয় এবং এর বিষয়বস্তু কীভাবে ডিকোড করতে হয় তা বোঝানোর জন্য সূক্ষ্মভাবে ডিজাইন করা নির্দেশাবলী রয়েছে।
১. পালসার (দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন তারা) মানচিত্র
সূর্যের অবস্থান ১৪টি পালসারের (দ্রুত ঘূর্ণায়মান তারা যা রেডিও তরঙ্গ নির্গত করে) সাথে সম্পর্কিতভাবে দেখানো হয়েছে।
বাইনারি সংখ্যা এই পালসারের ফ্রিকোয়েন্সি নির্দেশ করে, যা উন্নত সভ্যতাকে সৌরজগতের অবস্থান চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে।
২. হাইড্রোজেন অণুর চিত্র
আবরণের শীর্ষে হাইড্রোজেনের দুটি সর্বনিম্ন শক্তি অবস্থার সরল অঙ্কন রয়েছে।
এটি একটি সর্বজনীন মাপকাঠি হিসাবে কাজ করে, কারণ হাইড্রোজেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত মৌল।
এই অবস্থার পরিবর্তনকে সময় ও দূরত্বের মৌলিক একক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
গোল্ডেন রেকর্ড আবরণের চিত্র-এর ব্যাখ্যা
৩. রেকর্ড বাজানোর নির্দেশাবলী
এই চিত্রে দেখানো হয়েছে কীভাবে স্টাইলাস বসাতে হবে এবং রেকর্ড ঘুরাতে হবে।
এতে মডুলেটেড সিগন্যালগুলি পড়ার পদ্ধতিও নির্দেশ করা হয়েছে যা শব্দ ও ছবি ধারণ করে।
৪. ছবি এনকোডিং
গোল্ডেন রেকর্ডে থাকা ছবিগুলি অ্যানালগ সিগন্যাল হিসেবে সংরক্ষিত।
চিত্রে দেখানো হয়েছে কীভাবে পিক্সেলগুলো সংরক্ষিত এবং পুনর্গঠিত হয় যখন রেকর্ড বাজানো হয়।
ইঞ্জিনিয়াররা ১৯৭৭ সালের এই ছবিতে ভয়েজার-১ গোল্ডেন রেকর্ডের উপর ঢাকনা এঁটে দিচ্ছেন।
পেইল ব্লু ডট: আমাদের ঘর
পেইল ব্লু ডটঃ পৃথিবী থেকে ৩.৭ বিলিয়ন মাইল (৬ বিলিয়ন কিলোমিটার) দূর থেকে এই ছবিটি ভয়েজার ১ তুলেছিল ১৯৯০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি।
"আমরা (গভীর মহাকাশ থেকে) এই ছবিটি তুলতে সক্ষম হয়েছি, এবং, এই ছোট্ট বিন্দুটা আরেকবার দেখ । এটাই এই পৃথিবী, এটাই আমাদের ঘর, এটাই আমরা ।
এই ছোট্ট বিন্দুতে তুমি এতদিন যাদের ভালবেসেছ, যাদের চিনতে, যাদের কথা তোমার কানে এসেছে, প্রতিটি মানুষ যারা জন্মেছিল, জীবনটা পার করে দিয়েছে তারা সবাই । এটাই আমাদের আনন্দ আর কষ্টের যোগফল, এত এত ধর্ম, এত এত চিন্তাধারা, এত এত অর্থনীতির মারপ্যাচ । এখানেই প্রত্যেক শিকারী শিকার করেছিল, এখানে পা রেখেছিল প্রত্যেক বীরপুরুষ-কাপুরুষ । সভ্যতা যারা তৈরী করেছিল, যারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, সকল রাজা, সকল প্রজা এখানেই ছিল । সব প্রেমিক-প্রেমিকারা, প্রতিটা মা, প্রতিটা বাবা, স্বপ্নে বিভোর শিশু, আবিস্কারক-অভিযাত্রী,নৈতিকতার শিক্ষক, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, যত সুপারস্টার, যত জাঁহাবাজ নেতা, মানুষের ইতিহাসের সব সাধু-পাপী তাদের জীবন কাটিয়েছে এখানে, নক্ষত্রের আলোয় ভেসে বেড়ানো এই ছোট্ট ধুলো কণাটিতে ।
এই অসীম বিশ্বব্রহ্মান্ডে…..আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী ছোট্ট একটা রঙ্গমঞ্চ মাত্র । ভেবে দেখো তো, এই ছোট্ট বিন্দুর এতটুকু অংশের জন্য কত সেনাপতি, কত সম্রাট রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন । কিংবা সেই সীমাহীন নিষ্ঠুরতার কথা, যেটা করেছিল এই ছোট্ট বিন্দুর এক প্রান্তের মানুষেরা, আরেক প্রান্তকে হারিয়ে দেবে বলে । তাদের মধ্যে কী ঝগড়া, কী ঘৃণা, এক অপরের রক্ত দেখার সে কী আকুতি । আমাদের অহংকার, আমাদের ইগো, এই মহাবিশ্বে আমরা যে খুব সুবিধাজনক অবস্থায় আছি সেই শিশুতোষ বিভ্রম; সব এই ঝাপসা নীল আলোয় নড়ে ওঠে ।
এই প্রকট মহাজাগতিক অন্ধকারে আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবী বড় একা । এই বিশালতায়, এই অজ্ঞানতায় এমন কোন ইশারা ইংগিত নেই যে কেউ আসবে সাহায্য নিয়ে, আমাদের রক্ষা করতে, আমাদের নিজেদের হাত থেকে নিজেদের । আমরা যতটুকু জানি এই পৃথিবীই একমাত্র বাসযোগ্য স্থান । আর কিচ্ছু নেই, কিচ্ছু না । অন্তত নিকট ভবিষ্যতে নেই যেখানে আমরা পাড়ি জমাতে পারব । বেড়াতে যাব? সম্ভবত । বসতি স্থাপন? না, এখনও না । আমাদের ভাল লাগুক আর না লাগুক, এই মূহুর্তে এই পৃথিবীই আমাদের একমাত্র অবলম্বন ।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, যে এই জ্ঞান আমাদের বিনয়ী করে, চরিত্রকে মজবুত করে । অহংকারী মানুষকে মাটিতে নামিয়ে আনতে দূর থেকে তোলা পৃথিবীর এই ছবিটার চেয়ে ভাল কিছু মনে হয় না আর আছে । আমার কাছে এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের প্রতি আরেকটু সহানুভূতিশীল হতে । আর মনে করিয়ে দেয় আমরা যেন সংরক্ষণ করি, উপভোগ করি । এই ছোট্ট নীল বিন্দুটাকে, যে একমাত্র ঘরটিকে আমরা চিনি ।"
- কার্ল সেগান - এর বিখ্যাত লেখা "দ্যা পেইল ব্লু ডট" (১৯৯৪)
অনুবাদ: মোঃ নাহিদুল ইসলাম